32 C
Dhaka
শনিবার, অক্টোবর ১৬, ২০২১

ঘাড়ে কামড় ও অন্যান্য প্রসঙ্গে আব্দুস সালাম তালুকদার

যা পড়তে পারেন

:: মারুফ কামাল খান ::

তাঁর সঙ্গে কবে, কখন, কিভাবে, কোন উপলক্ষে, কার মাধ্যমে প্রথম পরিচয় ঘটেছিল আমার, তা বেমালুম ভুলে গিয়েছি। তবে সেটা ১৯৮৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপি’র মহাসচিব হবার পরেই হবে। তার আগে ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারের সঙ্গে আমার যে সরাসরি পরিচয় ছিল না, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। উনার আগে বিএনপির মহাসচিব ছিলেন ওবায়দুর রহমান। জাঁদরেল ডাকসাইটে নেতা। ভাষা সংগ্রামী, ছাত্রলীগের সভাপতি, ডাকসু’র জিএস, ছয় দফা আন্দোলন ও ‘উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রণী সংগঠক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেতা ছিলেন কে এম ওবায়দুর রহমান। স্বাধীনতার পর মন্ত্রিসভায় ছিলেন। পরে খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকারেও কন্টিনিউ করেন। বিএনপি গঠিত হলে তিনি এই দলে যোগ দেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া ও বিচারপতি সাত্তারের কেবিনেটেও ছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ১৯৮৮ সালে তাঁর স্থলে নতুন মহাসচিব করা হয় সালাম তালুকদারকে।

রাজনীতির অঙ্গনে ওবায়দুর রহমানের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল অসাধারণ। তাঁর প্রবল ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট প্রস্ফুটিত হতো উনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর এবং আচরণ ও চলন-বলনে। ওবায়েদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার খুবই হৃদ্যতা ছিল। তাঁকে ঘিরে রয়েছে উজ্জ্বল অনেক স্মৃতি। একটা ঘটনার কথা বলি। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সফররত শেখ হাসিনার বহরের ওপর গুলীবর্ষণ এবং এতে ২৪ জন নিহত হয়। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সারা দেশ ফুঁসে ওঠে। তখন আন্দোলনকারী ছিল বিরোধী দলগুলোর তিন জোট ও জামায়াতে ইসলামী। একটা লিয়াজোঁ কমিটি ছিল আন্দোলনের অভিন্ন কর্মসূচি গ্রহন ও সমন্বয় করার জন্য। খালেদা জিয়ার বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দল এবং বামপন্থীদের পাঁচ দলীয় জোট। এই তিন জোট ও জামায়াত চট্টগ্রাম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ২৬ জানুয়ারি সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে। দেয়া হয় ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে তিন জোটের যৌথ বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি দেয়। প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিল। আসছিল মিছিলের পর মিছিল। তবে স্বাভাবিক ভাবে পুরো কর্মসূচি জুড়েই ছিল আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ও প্রাধান্য।

ওবায়েদ ভাই একটা মিছিল নিয়ে এলেন সমাবেশস্থলে। পৌঁছেই চারদিকে তাকিয়ে বুঝলেন পুরো কর্মসূচি জুড়েই আওয়ামী লীগের আধিপত্য ও প্রাধান্য চলছে। লীগের শীর্ষ নেতারা মাইক্রোফোন একচেটিয়া দখলে নিয়ে রেখেছেন। একজন ছাড়ামাত্র তাদের আরেকজন হাতে নিচ্ছেন মাউথ স্পিকার। একটানা চলছে আওয়ামী বয়ান ও বন্দনা। অন্যান্য দলের যে মিছিলগুলো আসছে তারা দূরত্ব বজায় রেখে বসে যাচ্ছে পেছনের দিকে। দু’হাতে লোক ঠেলে শহীদ মিনারের পাদদেশে যেখানে নেতারা সার বেঁধে দাঁড়ানো দ্রুত তিনি সেখানে পৌঁছালেন। গলা কাঁপিয়ে তোফায়েল আহমেদ তখন একটানা ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন। ওবায়েদ ভাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, “অ্যাই তোফায়েল মাইক দে, কথা আছে।” তারপর নিজের হাতে মাউথ স্পিকার নিয়েই বলতে লাগলেন: “ভাইসব, জনগণের নেত্রী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী, সাত দল নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই সমাবেশে কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছাবেন। আপনারা জানেন….” ইত্যাদি। তোফায়েল আহমেদকে তখন ঠোঁট ও হাতের তালু উল্টিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছিল। বেগম জিয়া এসে পৌঁছা পর্যন্ত মাইক নিজের দখলে রাখলেন ওবায়েদ ভাই। এরমধ্যে বেগম জিয়া এসে গেলেন। পুরো সমাবেশ জুড়ে তখন বিএনপির পক্ষে উত্তাল জোয়ার। ম্যাডাম ভাষণ দিলেন। তারপর মিছিল বেরুলো তাঁর নেতৃত্বে। তবে শেখ হাসিনা আসলেন না শেষ পর্যন্ত। আওয়ামী লীগের বড় নেতারা এদিক ওদিক সটকে পড়লেন। বাকিরা ও বাম পাঁচ দলের নেতারা মিছিলে অংশ নিলেন ম্যাডামের নেতৃত্বে। পরে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন যে, শহীদ মিনারের কর্মসূচিতে তিনি যোগ দিতে গেলে তাঁর প্রাণনাশের জন্য হামলা হতো। বিশ্বস্ত সূত্র থেকে এ খবর আগাম পেয়েই তিনি আসেন নি। ঘটনাটি একদিকে সে আমলে ভিন্ন দলমতের হলেও একজন সিনিয়র নেতার প্রতি অন্য দলের নেতার মান্যতার নজির। অপরদিকে ওবায়দুর রহমানের রাজনৈতিক প্রতিপত্তির একটা প্রমাণ হিসেবেও ঘটনাটি দাগ কেটে আছে।

কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই ওবায়দুর রহমানের কী যে হলো, তিনি “বিএনপিতে গণতন্ত্র নেই, দেশে গণতন্ত্র আনার আগে দলে গণতন্ত্র আনতে হবে” বলে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়া শুরু করলেন। বুঝা যাচ্ছিল, দলের চেয়ারপার্সনের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ১৯৮৮ সালের ২১ জুন গভীর রাতে সংবাদপত্র অফিসে বিএনপি চেয়ারপার্সনের প্যাডে হাতে লেখা দু’টি প্রেস রিলিজ আসে। যার বার্তাপ্রেরক ছিলেন দলের তখনকার অন্যতম প্রচার সম্পাদক ফরিদা হাসান। প্রেসরিলিজ দু’টিতে জানানো হয়, বিএনপি চেয়ারপার্সন তাঁর ওপর অর্পিত গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতা বলে পার্টির জাতীয় স্থায়ী কমিটি ও জাতীয় নির্বাহী কমিটি বাতিল করেছেন। এই সিদ্ধান্তের অনিবার্যতায় ওবায়েদ ভাইও মহাসচিব পদ হারান। তেসরা জুলাই চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নতুন জাতীয় স্থায়ী কমিটি ও ৮২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেন। তাতে ওবায়দুর রহমান স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকলেও নতুন মহাসচিব করা হয় ব্যরিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারকে। গুজব শোনা যায়, রাতে ওবায়েদ ভাই নাকি এরশাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং পরদিন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে রাজি হয়েছিলেন। সে খবর কোনো ভাবে জেনে যান ম্যাডাম। তিনি দায়িত্বরত মহাসচিবের দলত্যাগের বিরাট ক্ষতি এড়াতে কমিটি ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেন। এতে এরশাদের কাছে ওবায়েদ ভাইয়ের উপযোগিতা কমে যায়। তিনি তাঁর শপথগ্রহন বাতিল করে দেন। সত্য-মিথ্যা জানিনা, এসব গুজব তখন পল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিএনপির নয়া স্ট্যান্ডিং কমিটিতে ওবায়েদ ভাইকে রাখলেও তিনি আর দলে সক্রিয় হননি। নিজের সমর্থকদের নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে তিনি বিএনপির ওবায়েদ গ্রুপ করেন। কিছুদিন পর এই গ্রুপের নাম বদল করে নাম দেন বাংলাদেশ জনতা দল। সেই দলের হয়ে জাহাজ মার্কা নিয়ে ইলেকশন করে কোনো সিট পান নি। এই দল বিলুপ্ত করে অবশেষে তিনি ফের বিএনপিতেই ফেরেন।

ফরিদপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার নিয়ে ঐ অঞ্চলে এককালের প্রভাবশালী জমিদার-রাজনীতিবিদ মোহন মিঞা নামে বহুল পরিচিত ইউসুফ আলী চৌধুরীর দুই পুত্র চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ও চৌধুরী আকমল ইবনে ইউসুফের সঙ্গে ওবায়েদ ভাইয়ের কিছুটা দ্বন্দ্ব ছিল। তারাও বিএনপি করতেন। এরশাদ আমলেই একবার চরাঞ্চল থেকে চৌধুরী সাহেবদের লাঠিয়ালেরা এসে ফরিদপুর শহরে ওবায়েদ ভাইয়ের সমর্থকদের সঙ্গে লাঠালাঠিও করেছিল। তবে জাতীয় পর্যায়ে এবং বিএনপির কেন্দ্রে ওবায়েদ ভাইয়ের তেমন কোনো বিরোধিতাই ছিল না। বিএনপির নেতৃত্বের পর্যায় থেকে সেই ওবায়দুর রহমানের আকষ্মিক কক্ষচ্যুতি ছিল এক বিষ্ময়কর ঘটনা। ফলে তাঁর পদে নিযুক্ত ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদার সকলের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ান। ওবায়েদ ভাইয়ের মতন সালাম তালুকদারও প্রেসিডেন্ট জিয়া ও জাস্টিস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন। তবে ওবায়েদ ভাইয়ের মতন তাঁর এক্সপোজার ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ছিল না। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন ও পরবর্তীকালে ন্যাপের রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও সালাম ভাই অগ্রণী কোনো ভূমিকায় ছিলেন না। ১৯৭৬ সালে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে জড়ান। খোন্দকার মোশতাক আহমদের ডেমোক্রেটিক লীগে যোগ দেন। বিএনপি গঠিত হলে তিনি দ্রুত ডিএল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে মন্ত্রিসভা সদস্য হন তিনি।

সালাম ভাইয়ের অনেক গুণাবলীর মধ্যে সমালোচনাযোগ্য একটা সংকীর্ণতা ছিল। জাতীয়তাবাদী হলেও তাঁর মধ্য একটা আঞ্চলিকতার মনোভাব কাজ করতো বলে অনেকেরই অভিযোগ। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রতি তাঁর একটা সহজাত আনুকূল্য ছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি মহাসচিব হলে ছাত্রদলে ময়মনসিংহ অঞ্চল ভিত্তিক একটা গ্রুপ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে ম্যাডাম যখন তাঁকে দৈনিক দিনকাল পত্রিকা পুনর্গঠনের দায়িত্ব দেন তখনও তিনি এর পরিচালনা পরিষদ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন। আমার পূর্ব পুরুষ বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে এসে বগুড়ায় স্থায়ী নিবাস গড়েছিলেন। সালাম ভাই সেটা জানতেন না। আমাকে বগুড়ার লোক বলেই জানতেন। তবুও কেন জানিনা, পরিচিত হবার পর থেকেই তিনি আমাকে দারুণ ভাবে পছন্দ করতে শুরু করেছিলেন এবং নানান রকম চড়াই-উৎরাই ও টানাপড়েন সত্বেও শেষ অব্দি তা অব্যাহত ছিল। বালখিল্যতা ও আবেগের বশে আমি অনেক সময়ই সালাম ভাইয়ের প্রতি চরম অবিচার ও অসদাচরণ করেছি। কিন্তু তাঁর অপরিমেয় স্নেহ ও প্রশ্রয়ের ছায়া থেকে কখনো বঞ্চিত হইনি। তিনি হয়তো কষ্ট পেয়েছেন কিন্তু কখনো পালটা রূঢ় আচরণ করেননি। পরিণত বয়সে এসে এখন বুঝি, কতো অপরিণত আচরণই না করেছি তাঁর সাথে। কিন্তু দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাইবারও কোনো সুযোগ তো আজ আর নেই।

খুব ফর্মাল মানুষ ছিলেন তিনি আপাতদৃষ্টিতে। কেতাদুরস্ত ছিলেন পোশাক-আশাকেও। কথা বলতেন খুব মেপে। প্রখর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পরিমিতিবোধ, সৌজন্য ও মাত্রাজ্ঞান ছিল তাঁর অসামান্য। আমি ১৯৯৫ সালের দিকে সালাম ভাইয়ের তীব্র সমালোচনা করে লিখলাম, “বিএনপির মতন দলের মহাসচিব পদে আছেন চরম সামন্তবাদী এক ভদ্রলোক। তাঁর ভাষায়ও সামন্ত ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘রাজপথ কাউকে ইজারা দিই নাই।’ তাঁর মুখে শুনি ‘মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের মৌরসি পাট্টা নয়।’ তিনি সব সময় স্যুটেড বুটেড হয়ে চলেন। সেই যে কবে তিনি লিংকন্স ইন থেকে একটা লাল টাই পরে বেরিয়েছিলেন, সেটা এখনও ছাড়তে পারেন নি। এখন যে এই লাল টাই বাটলাররা ছাড়া কেউ পরেনা, সে-খবরও উনি রাখেন না। উনাকে কখনো হাসতে দেখেছে এমন কথা কেউ হলফ করে বলতে পারবে না। আবেগশূণ্য এমন একজন লোক বিএনপি মহাসচিব থাকা অব্দি এ দলটির গণমুখী হবার কোনো অবকাশই নেই।” আমার এই লেখা প্রকাশের ক’দিন পর প্রেসক্লাব ক্যান্টিনে বসেছিলাম। কে একজন এসে খবর দিল প্রেসিডেন্ট সাহেব সালাম দিয়েছেন। দোতলায় উঠে ক্লাব প্রেসিডেন্টের কামরায় গিয়ে দেখি সালাম ভাই বসা। তাঁকে ঘিরে দশ-বারো জন সাংবাদিক। আমি ঢুকতেই কয়েকজন সমস্বরে বললেন, “এই তো এসে গেছেন।” বুঝলাম আমাকেই ধরতে এসেছেন সালাম ভাই। জোর করে টেনে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসালেন। বললেন, “এতো রাগ হলে চলবে?” বললাম, “রাগের কিছু নাই। আপনারা পলিটিশিয়ান মানেই স্বার্থপর। দরকার ছাড়া খোঁজ-খবরই রাখেন না।” বললেন, “পুরোটা অস্বীকার করি না। তবে আমার শরীরটা বেশি ভালো না। দল ও সরকারের কাজের চাপে ব্যস্তও থাকতে হয়। আমি না-হয় সব সময় আসতে পারিনা। কিন্তু অভিযোগ তো আমিও করতে পারি। খোঁজ-খবরের ব্যাপারটা তো কেবল ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক নয়।” এ রকম আরো কিছু কথা বলে তিনি পরিবেশ দ্রুত হালকা ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে ফেললেন। বিএনপির পক্ষে প্রচার-মাধ্যমকে আরো কিভাবে সক্রিয় করা যায় সে আলোচনায় চলে গেলেন। সকলের মতামত চাইলেন। কথা প্রসঙ্গে আমাদের এক বন্ধু সাংবাদিক বললেন, এখন বিএনপির পক্ষে নিরপেক্ষতার ভড়ং ধরা তথাকথিত নিরীহ সাংবাদিকতা দিয়ে চলবে না। এমন এক সাংবাদিকতা লাগবে যেটার কথা সাংবাদিকতার অভিধানে নেই। সেটা হলো বাইটিং জার্নালিজম মানে কামড়ানো সাংবাদিকতা। রিপোর্ট ও লেখালেখি এমন হতে হবে, তা’ যেন শেখ হাসিনার ঘাড়ে গিয়ে কামড়ে ধরে। সালাম ভাই তার কথা শুনে ইংরেজিতে মন্তব্য করলেন: “She has many more suitable places to bite. Why are you so attracted to her neck?” (কামড় দেয়ার জন্য আরো উপযুক্ত জায়গা থাকতে আপনি উনার ঘাড়ের দিকে এতোটা আকৃষ্ট হলেন কেন?)। হাসির একটা হুল্লোড় পড়ে গেলো। আমি যে সালাম ভাইয়ের কতোটা ভুল সমালোচনা করেছিলাম, তা হাতে-কলমে আমার নিজের কাছেই প্রমাণিত হলো। নিজের লেখার জন্য আমি নিজের কাছেই লজ্জিত বোধ করতে লাগলাম।

সালাম ভাইয়ের সঙ্গে পরে আরেকবার চরম বেয়াদবি  করেছিলাম। সেটা ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী রাতে। কাকরাইলে মোরশেদ খানের মালিকানার একটি ভবনে ছিল বিএনপির নির্বাচনী অফিস। সেখানে নির্বাচনোত্তর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার উদ্দেশ্যে প্রেস ক্লনফারেন্স। চারদিক থেকে খবর আসছিল পরাজয় আর বিপর্যয়ের। হাতে গোণা ক’জন বাদে মন্ত্রিবহর প্রায় পুরোটাই হেরেছে। ফলে ১১৬ আসনে বিজয়ী হলেও বিএনপিকে পরাজয়ের স্বাদ গ্রহন করতে হয়। বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল সাংবাদিক হিসেবে আমরাও খুব বিপর্যস্ত ও ক্ষুব্ধ। প্রেসক্লাব থেকে আমরা দল বেঁধে গেলাম কাকরাইল। পরাজিত প্রার্থীরা তখন তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছিলেন। আব্দুল মতিন চৌধুরী ছিলেন হোম মিনিস্টার। তিনি বলছিলেন, পুলিশ কিভাবে পক্ষপাতিত্ব করেছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কারচুপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলায় পুলিশ উল্টো তাকেই দু’ঘন্টা একটা ঘরে আটকে রাখে। “থামেন আপনে।” আমাদের ফোরামের প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতা খন্দকার মুনিরুল আলম ধমকে উঠলেন। “ছিলেন হোম মিনিস্টার। আর পুলিসের সেপাই আপনাকে আটকে রেখেছে, বলতে শরম করছেনা?” মতিন চৌধুরীকে থামিয়ে মাইক হাতে নিলেন সালাম ভাই। তিনি দু’চার লাইন সূচনা বক্তব্য দিয়ে সরিষাবাড়ির নির্বাচনী অনিয়মের বিবরণ পেশ করতে শুরু করলেন। আমরা কয়েকজন একযোগে হৈচৈ করে উঠলাম। বাধা দিলাম তাঁর বক্তব্যে। “সরিষাবাড়ির কথা শুনবো না। সারা দেশের চিত্র দিন।” উনি আহত চেহারা নিয়ে বিষ্মিত কণ্ঠে বললেন, “কেন? সরিষাবাড়ি কি দেশের বাইরে নাকি?” আমি গলা চড়িয়ে বললাম, “সালাম ভাই, দলের মহাসচিব হিসেবে দুই আসনে কন্টেস্ট করে দু’টিতেই হেরে এসেছেন। আপনারা যারা বড় নেতা ও মন্ত্রী ছিলেন তাদের ব্যর্থতায় দল হেরেছে। আজ প্রথমেই উচিত ছিল ব্যর্থতার দায় নিয়ে মহাসচিব পদ থেকে আপনার পদত্যাগ করা। আপনার মুখে এখন কারচুপির বয়ান কি মানায়?” সালাম ভাই ম্লান মুখে বললেন, “বুঝতে পারছি। বিএনপির প্রেস কনফারেন্স এখন আপনারাই কন্ট্রোল করছেন এবং আমরা কী বলবো তাও আপনারাই ডিক্টেট করছেন। এই রকম পরিস্থিতিতে আমার আর কিছুই বলার নেই।” বি. চৌধুরী সাহেব এ অবস্থায় হাল ধরলেন এবং তাঁর ক্যারিশমা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেন। এই ঘটনাটি আমি আজও ভুলিনি, আমাকে সব সময় পীড়া দেয় এবং এরজন্য আত্মগ্লানি ও আত্মদহনে ভুগি। আশ্চর্যের ব্যাপার, এ ঘটনার পর সালাম ভাই আরো কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে অনেকবার দেখা-সাক্ষাত হয়েছে কিন্তু তিনি একবারের জন্যও বুঝতে দেননি যে, আমাদের অমন উদ্ধত আচরণে কতটা কষ্ট তিনি পেয়েছিলেন!

তখন এরশাদ শাসনামল। গ্রামের বাড়ি গেছি। শাহ্ ফজলুল হক ফরিদ ভাই আমাদের এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী লোক। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং আমাদের পাশের চন্দনবাইশা ইউনিয়নের দীর্ঘকালীন চেয়ারম্যান। ফরিদ ভাইয়ের বৌ কেটি আপাও খুব স্নেহ করেন আমাকে। কার্ড দিলেন, তাদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে। মেয়ে ঢাকায় পড়ে। সেখানেই জানাশোনা ও সম্পর্ক হয়েছে ছেলেটির সাথে। সরিষাবাড়ির পাত্র। চন্দনবাইশা বাজারে যেতেই লোকমুখে প্রবল গুঞ্জন, সালাম বারিস্টার আসছেন ফরিদ চেয়ারম্যানের বাড়িতে। গিয়ে দেখলাম উঁচু বারান্দায় সালাম ভাই বসে আছেন চেয়ারে। আমাকে দেখেই বিষ্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন: “আরে, আপনি এখানে?” বললাম: “আমার বাড়ি এখানে, আমি তো থাকবোই। প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কেন এখানে?” জানলাম, পাত্র উনার ভাতিজা। খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেলো। তবে দুঃখের বিষয় বিয়েটা শেষ অব্দি খুব বেশি দিন টেকেনি। যা হোক, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সিনিয়র সাংবাদিক আমানুল্লাহ্ কবীর জামালপুরের মানুষ। তাঁর সঙ্গে সালাম ভাইয়ের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। কবীর ভাই একদিন বিকেলে প্রেসক্লাবে বললেন, “চলেন এক জায়গা থেকে ঘুরে আসি।” জানতে চাইলাম কোথায়? বললেন, “বিএনপি অফিস। সঙ্গে গাড়ি আছে। আবার ফিরবো ক্লাবেই।” বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিস তখন ধানমণ্ডিতে। যদ্দুর মনে পড়ে, কবীর ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক মঈনুদ্দীন নাসের। তাদের বোধহয় আগে থেকেই প্রোগ্রাম সেট করা ছিল। আমাকে হাতের সামনে পেয়ে সঙ্গী করে নিলেন। আমরা গিয়ে বসলাম মহাসচিব সালাম ভাইয়ের রুমে। তিনি চা-বিস্কুট আনিয়ে খাওয়ালেন। বিএনপির উদ্দেশে কবীর ভাইয়ের কিছু পরামর্শ ছিল। সেগুলো তিনি পয়েন্ট বাই পয়েন্ট ইংরেজিতে টাইপ করে নিয়েছিলেন। সালাম ভাইকে পড়ে শোনালেন। তিনি শুনে বললেন, “আমার কোনো দ্বিমত নেই। তবে আপনারা এগুলো বেগম সাহেবাকে সরাসরি শোনালে ভালো হয়।” সালাম ভাই ম্যাডাম জিয়াকে বেগম সাহেবা বলতেন। কবীর ভাই বললেন, “আপনি শোনালেই তো হয়।” সালাম ভাই বললেন: “এসব আইডিয়া আপনাদের। কপি রাইটও আপনাদের। ক্রেডিট আমি নেবো কেন?”

একজনকে ডেকে সালাম ভাই বললেন: “চেয়ারপার্সনের কামরায় যে-সব চার্লি ফার্লি আছে ওদের সরাও। আমি কথা বলবো। মেহমান থাকবেন সঙ্গে।” অল্প কিছুক্ষণ পরই ডাক এলো ম্যাডামের রুম থেকে। সালাম ভাইয়ের পিছু পিছু আমরা ঢুকলাম। ঢুকেই মহাসচিবের মুড অফ হয়ে গেলো। সে-সময় মোটামুটি প্রভাবশালী হয়ে ওঠা এক যুবনেতা তখনো ঠাঁয় বসে আছেন। মহাসচিব চার্লি ফার্লিদের সরাতে বললেও সেই নেতা সাহেব নিজেকে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভেবে নিয়ে গ্যাট হয়ে বসেছিলেন। তিনি সালাম ভাইকে উদ্দেশ করে বললেন, “সালাম ভাই, কনফিডেনশিয়াল কিছু না-তো? আমি থাকতে পারবো তো?” তার কথায় ভ্রূক্ষেপও করলেন না, কোনো জবাবও দিলেন না সালাম ভাই। ম্যাডামকে বললেন আমানুল্লাহ্ কবীর ভাইয়ের প্রস্তাবনার কথা। চেয়ারপার্সন আগ্রহ দেখালে কবীর ভাই তার কাগজ আবারো পড়লেন। ম্যাডামের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে কবীর ভাই তার পরামর্শগুলো ব্যাখ্যাও করলেন। এক ফাঁকে ওই যুবনেতা হুট করে বলে উঠলেন, ‘আমি একটা কথা বলি?’ এবার মহাসচিব ঘাড় ঘুরিয়ে খুব ক্রুদ্ধ চোখে তাকালেন যুবনেতার দিকে। তার নাম ধরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন: “উই আর টকিং অ্যাবাউট পলিটিক্স। এখানে তোমার কী বলার আছে?” যুবনেতা উঠে দাঁড়িয়ে “স্যরি স্যরি” বলতে বলতে ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে গেলেন। ম্যাডামের মুখেও হালকা একটা হাসির রেখা ফুটে উঠলো।

এ পর্যন্ত লেখার পর মনে হলো সালাম ভাইকে নিয়ে আসল কথাগুলোই তো এখনো বলা হয় নি। তাঁকে নিয়ে অল্পকথায় স্মৃতিকথার ঝাঁপির মুখ বন্ধ করা আসলে সম্ভবও নয়। কিন্তু এ পর্ব তো ইতোমধ্যেই যথেষ্ট লম্বা হয়ে গিয়েছে। দৈর্ঘ্য আরো বাড়ালে সেটা পাঠকের প্রতি অবিচার করা হবে। তাদের ধৈর্য্যের ওপর আর কতো চাপ বাড়াবো? মনে হয়, সালাম ভাইকে নিয়ে লেখা এক পর্বে শেষ করা যাবে না। তাই আজ থাক এ পর্যন্তই। পরে আরেক পর্বে হয়তো বলা যাবে আরো কিছু কথা।

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

15 − 14 =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা