30 C
Dhaka
শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১

আল খালিদ ট্যাংক ও পাক সেনাপ্রধানের জন্য আনারস

যা পড়তে পারেন

:: আবু রুশদ ::

২০০৯ সাল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ট্যাংক কিনবে এক রেজিমেন্ট। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চার দেশের চারটি ট্যাংক সেনাবাহিনীর উপযুক্ততার মান ডিঙ্গাতে পেরেছে ও সেগুলোই কেবল টেন্ডারে অংশ নেয়ার জন্য বিবেচিত হয়েছে। এগুলো হলো চীনের এমবিটি ২০০০, রাশিয়ার টি-৮০, ইউক্রেনের টি-৯০ ও পাকিস্তানের আল খালিদ। ওইসময় সেনাবাহিনীতে আমার কোর্সমেট অবসরপ্রাপ্ত মেজর ওয়াহিদ ছিল ইউক্রেনের ট্যাংকের ডিলার। তবে ও সাঁজোয়া বাহিনীর অফিসার হওয়ায় সেনা সদর দফতরের তদানীন্তন সাঁজোয় পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তুষার কান্তি চাকমা ওকে পাকিস্তানের ট্যাংকের ডিলারশিপ নেয়ার জন্য উপদেশ প্রদান করেন। তখনো পাকিস্তানের ট্যাংক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হেভি ইন্ডস্ট্রিজ টাক্সিলা’র (এইচ আই টি) কোন এজেন্ট বাংলাদেশে ছিল না। আমার সম্পাদিত ডিফেন্স জার্নালের অফিস ছিল ওয়াহিদের অফিসের এক দিকে। ওয়াহিদ ওইদিনই এসে এনিয়ে আলাপ করে আমার সাথে। আমি ওকে বলি-দোস্ত, পাকিস্তানীদের সাথে কথ বলা যাবে, কিন্তু আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা তো আইএসআই বানিয়ে দিবে আমাদের দুইজনকে! ও বলে- কেন? আমরা তো সেনাবাহিনীর জন্য কাজ করবো, দেশের জন্য কাজ করবো। ওরা কেন রিপোর্ট করবে? করবে রে, কে যে কোথায় কি রিপোর্ট করবে তা আল্লাহই জানে। যাহোক, নেতিবাচক দিক বিবেচনা করার পরও সেনা সদর দফতরের অনুরোধ বিবেচনায় ঢাকাস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের ডিফেন্স এডভাইজার ব্রিগেডিয়ার সাজ্জাদ রসুলের সাথে যোগাযোগ করলাম। আমি যেহেতু সাংবাদিকতার শুরু থেকেই প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিট করে আসছি তাই সঙ্গত কারনেই ঢাকায় সকল দেশের সামরিক ‍উপদেষ্টা ও কূটনীতিবিদদের সাথে যোগাযোগ ছিল ও আছে। সেই সূত্রে ব্রিগেডিয়ার সাজ্জাদের সাথেও পরিচয় ছিল। তিনি ছিলেন কারগিল যুদ্ধের একজন ভেটেরান। ওয়াহিদ ও আমার কাছ থেকে সব শুনে ব্রিগেডিয়ার সাজ্জাদ বললেন- কোন অসুবিধা নেই।

আমরা তো তোমাদের সেই ২০০২ সাল থেকে ট্যাংক দিতে চাচ্ছি, তোমরাই তো নিচ্ছ না। তবে তিনি আমাদের উপদেশ দিলেন যে পাকিস্তানের কালচার অনুযায়ী সাথে যেন একজন সিনিয়র অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলকে এই প্রজেক্টে রাখি। পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির ৪৫ তম লং কোর্সের অফিসার মেজর জেনারেল আব্দুল মতিন ছিলেন আমার জার্নালের উপদেষ্টাদের একজন। স্যারের আবার কোর্সমেট হচ্ছেন সেসময়কার পাক সেনাপ্রধান জেনারেল কায়ানী।সোনায় সোহাগা। স্যারকে বলতেই রাজী হয়ে গেলেন। ব্রিগেডিয়ার সাজ্জাদ এদিকে আমাদের সবার ভিসা ও যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিলেন। পাকিস্তানে গিয়ে যেন এই সুযোগে পিওএফ বা অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরীটাও দেখে আসি তাও বলে দিলেন। নিরাপত্তা ছাড়পত্র লাগবে না? জানতে চাইলে তিনি হেসে বললেন- তোমরা আমাদের কি ক্ষতি করবে? ওগুলি লাগবে না। মতিন স্যারকে জাস্ট বলে দিও, উনি ব্যবস্থা করে নিবেন…!জেনারেল মতিন যাওয়ার আগের দিন অফিসে এলেন জেনারেল কায়ানি, এম এস লে. জেনারেল মহসিন কামাল,এইচ আই টি ও পিওএফ-এর চেয়ারম্যানের জন্য কি গিফট নিয়ে যাওয়া যায় সেসব নিয়ে আলোচনা করার জন্য?ওগুলো ঠিক করা হলো। ওয়াহিদ বললো-স্যার কিছু ভালো আম প্যাক করে নিয়ে যাই। না, ওদের ওখানে আমাদের চেয়ে অনেক ভালো আম উৎপন্ন হয়। ওরা আমাদের আনারস খেতে পাগল। আনারস নিয়ে চলো। আনারস পেলে সাত খুন মাফ। দেখবে সব সহজ হয়ে যায় কেমনে ম্যাজিকের মতো।আনারসে পাকিস্তানীদের দুর্বলতা আগে জানতাম না। ওয়াহিদ বললো -ওটা তো স্যার অনেক বড় প্যাকেট হয়ে যাবে। তাতে কি? চার জনের জন্য ভালো দেখে আনারস কিনে আনো। ইজ্জত কা সওয়াল। পাক সেনাপ্রধান আনারস খাবেন। উনি আবার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ছোটবেলায় পড়ালেখা করেছেন ক্যান্ট স্কুলে। আইএসআইয়ের মহাপরিচালকও ছিলেন। বেস্ট পসিবল আনারস নিয়ে আসা হলো। ওয়াহিদ সেনাবাহিনীতে যেমন অতি উঁচু মানের অফিসার ছিল তেমনি উঁচুমান নিয়ে আনারস পরীক্ষা করে দেখলো। কিছু বাদ গেলো। চারটি বড় কার্টুন তৈরি করলো অফিসের স্টাফরা। ভাগ্য ভালো আমরা বিজনেস ক্লাসে যাচ্ছিলাম। পিআইএ তাই অনায়াসে আমাদের ইয়া ঢাউস সব কার্টুন গ্রহন করলো সানন্দে। করাচী পৌছার পর জেনারেল মতিন ও ওয়াহিদ একপাশে দাঁড়িয়ে কি যেন খোশালাপ করছিল। আমি নজর রাখছিলাম লাগেজ বেল্টে। কাস্টমস ঠিকই বিশাল সাইজের কার্টুনগুলো আলাদা করলো। অফিসার আমার কাছে জানতে চাইলেন- এসবে কি? পান নাকি? পান পাকিস্তানে খুবই জনপ্রিয় জিনিস এবং বাংলাদেশের পান প্রতি ফ্লাইটে যায়। আমি যখন বললাম আনারস তখন কাস্টমস অফিসারের চোখ আরো জ্বলজ্বল করে উঠলো। এতোগুলো কেন? কোথায় সাপ্লাই দিতে এনেছেন? পাশে গিয়ে আস্তে করে উনার কানে কানে বললাম- ভাইরে পিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে জেনারেল কায়ানি নামে এক মশহুর বান্দা আছেন। এগুলো উনাকে দিতে হবে। জেনারেল মতিনকে দেখিয়ে আরো যোগ করলাম- ওই যে দেখছেন একজন শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক দাড়িয়ে আছেন তিনি ওই কায়ানি সাহেবের বন্ধু ও উনিও জেনারেল! বেচারা ইলেকট্রিক শক খেলো। পাকিস্তান মানে মিলিটারি, মিলিটারি মানে পাকিস্তান! মুহূর্তেই সব ক্লিয়ার।!ইসলামাবাদ বিমান বন্দরে নামার পর দেখি জেনারেল কায়ানির স্টাফ এসেছেন আমাদের রিসিভ করতে। ইয়া ভোমা এক গাড়ি জেনারেল মতিনের জন্য। সাথে হুটার লাগানো মটর সাইকেল নিয়ে কয়েকজন মিলিটারি পুলিশ। বন্ধুত্ব কাকে বলে! আমাদের নিয়ে উঠানো হলো পিন্ডির সেন্ট্রাল আর্টিলারি অফিসার্স মেসে। এটাই সেই এককালের বিখ্যাত পিন্ডি ক্লাব যেখান দুপুরের খাওয়ার পর দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া হার্ট এ্যাটাকে ইন্তেকাল করেন। জেনারেল স্যারের তো সব মাফ, আমাদের পুরো করতে হয় আনুষ্ঠানিকতা। ওয়াহিদ রেজিস্টারে নাম লিখছে। বিএ ২৮৮৬ ওয়াহিদ, বিএ ২৮৮৯ আবু রূশদ। রিসিপশন ক্লার্কের মাথা আউট। সে বারবার নম্বর দেখে আর অবাক হয়। ওয়াহিদ পাকিস্তানে বেসিক কোর্স করেছে ১৯৮৭ সালে তাই ও কিছুটা উর্দু জানে। ক্লার্ককে বলা হলো যে আমরা পাক আর্মির না, খাস বাঙ্গাল মুল্লুকের আর্মি! তাই নম্বর অতো উপরে!

রিটায়ার্ড সুবেদার ক্লার্ক একসময় আমাদের সেনাপ্রধান জেনারেল আতিকের সাথে কাজ করেছেন পাকিস্তান আমলে। যাহোক, সেবার আল খালিদ ট্যাংক ইন্ডাস্ট্রিসহ পিওএফ দেখা হয়েছিল। আমাদের ট্যাংকের ডিলারশিপ দেয়া হয় সাথে সাথে। ওয়াহিদ দেশে এসে সব ব্যবস্থা করতে থাকে টেন্ডারে অংশ নেয়ার জন্য। এদিকে সেনা সদর দপ্তর থেকে এই ক্লারিফিকেশন চায় তো সেটা হাতে হাতে দূতাবাসে ডিএ’র কাছে প্রায়ই নিয়ে যেতে হয়। আবার ডিএ খবর দেয় যেতে তাদের পক্ষের কথাবর্তা বলার জন্য। সব গোপনীয় ও স্পর্শকাতর ধরনের। ওরা আমাদের ওদের টেকনোলজি দিবে কি না দেখে? কিন্তু কে কাকে বোঝাবে? একদিকে আমরা করছি সেনাবাহিনীর কাজ আর আরেকদিকে ওয়াহিদ ও আমর নামে গোয়েন্দা সংস্থা করছে নানা রসাত্মক রিপোর্ট! আমি তো সাংবাদিক হিসাবে কষ্ট তাও কিছু দেখেছি জীবনে, ওয়াহিদ বেচারার জীবন যায় আর কি? ওই প্যাচ এখনো আছে এবং এক পর্য়ায়ে চীনের চাপে পাকিস্তান শেষ মুহূর্তে টেন্ডার থেকে সরে দাড়ায়। বাংলাদেশে আসে চীনের ট্যাংক। আনারস পেয়ে কি হয় তা দেখে এসেছিলাম। ওদের আর্মির জিএইচকিউ’র মিলিটারি সেক্রেটারি লে. জেনারের মহসিন কামাল তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফ কারের একটা আমার ও ওয়াহিদের জন্য দিয়ে দিয়েছিলেন! ওই তিন তারকা জেনারেলের স্টাফ কার নিয়ে আমরা ইসলামাবাদ ঘুরেছি! আর জেনারেল মতিন স্যার তো জেনারেল কায়ানীর সাথে জিএইচকিউতে আড্ডা মারতে গিয়েছেন দু’বার। যেখানেই যেতেন সাথে মিলিটারী পুলিশের পাহারা থাকতো সাথে! কোথায়ও কোন ক্লিয়ারেন্স নেয়ার ঝামেলা নেই! আনারস বলে কথা…!

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

one × three =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা