28 C
Dhaka
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১

আমাদের গণমাধ্যম দৃষ্টান্তশূন্য হয়ে পড়েছে

যা পড়তে পারেন

:: ফিরোজ আহমেদ ::

‘গুলশানে তরুণীর মরদেহ উদ্ধার, মিডিয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন’ এই শিরোনামে ২৮ এপ্রিলের ডেইলী স্টারের Straight From Star Newsroom আয়োজিত আলাপটা দেখলাম। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি বহু বিষয়ে সন্তোষজনক হলেও দুটো প্রসঙ্গ নিয়ে পর্যবেক্ষণ জানাই:

ক. আলোচনার শিরোনাম ‘গণমাধ্যমের নীতি নিয়ে প্রশ্ন’, অথচ প্রধান প্রশ্নটিই বাদ পড়ে গেছে। মুনিয়ার মৃত্যুতে প্রথম থেকেই গণমাধ্যমের নীতি বিষয়ক সব চাইতে প্রবল আলোচিত প্রশ্নটি সন্দেহাতীতভাবেই ছিল, সোজা বাংলায় বলা যায়, গণমাধ্যম টাকা খেয়ে কাজ করেছে কি-না। এবং এখনও করে যাচ্ছে কি-না।

মানুষের ধারণায় টাকা খাওয়াটা আসলে দুই রকম, একটা তো যাকে বলে সরাসরি টাকাই খাওয়া, যেমনটা দৈনিক দেশ রুপান্তরের মত পত্রিকাগুলোর নিউজরুমের কর্মকুশলতায় আমরা সকলেই দেখতে পাচ্ছি। এই জাতীয় সাংবাদিকতা অপরাধীর অপরাধ আড়ালে ভূমিকা নেয়ার অপরাধটি করে। আরেকটা হলো বিজ্ঞাপন বন্ধের ভয়ে অপরাধের অংশীদার না হয়েও যতটা সম্ভব ছিল, ততখানি খোড়াখুড়ির কাজটা না করা। যেমনটা আল জাজিরার দৃষ্টান্তটিতে ডেইল স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বাস্তবতাটিকে সৎভাবেই তুলে ধরেছিলেন। তার সেই বক্তব্যের কিছুটা অংশ এখানে অনুবাদ করে দিচ্ছি:

“না, আমরা কিচ্ছুটি করি নাই, কেন না এরা সবাই আর্থিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা-ঘনিষ্ঠ, এবং তাদের ঘাঁটাবার সাহস আমাদের নাই। কখনো কখনো আমরা আমাদের নিজস্ব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করি বটে, কিন্তু কেবল ততদূর পর্যন্তই, যাতে আসলে যারা কলকাঠি নাড়েন, তাদের আড়ালে রাখা যায়, অথবা কেবল তখনই, যদি মূল অপরাধীদের রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কোন প্রতিপত্তি আদৌ না থাকে, কিংবা যখন আমাদের অনুসন্ধানের উদ্দিষ্টরা আর ক্ষমতার সুনজরে নেই।”

আমাদের গণমাধ্যম আসলে দৃষ্টান্তশূন্য হয়ে পড়েছে। ঝুঁকি না নিতে নিতে, মেনে নিতে নিতে গণমাধ্যমের সংস্কৃতি এত বিষাক্ত হয়ে গেছে যে আপাতত এখানে কিছুই আশা করতে পারছি না। অজস্র দোষত্রুটি সত্ত্বেও সামাজিক গণমাধ্যমই তাই এখন যা কিছু ভরসা; টাকা খেয়ে লেখা, কিংবা বিজ্ঞাপন খেয়ে নীরব থাকা গণমাধ্যমের যুগে এই নতুন মাধ্যমের চাপে তাপে .পে মানুষ দুচারটা কথা জানতে পারছে, বলতেও পারছে। কারণ বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যমই গণমাধ্যমের এই্টুকু পর্যালোচনা প্রকাশ করার মত, এমনকি আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে নিজেরাই আত্মসমালোচনা কররবার মত পরিশীলিত বা সভ্য হয়ে ওঠেনি এখনো। 

ফলে, তার স্বীকারোক্তিতে, গণমাধ্যম আছে এই এমন একটা দশায়, যেখানে “(আমরা)খারাপ কিছু দেখি না, খারাপ কিছু শুনি না, খারাপ কিছু বলি না।”

এই বক্তব্যটা দিয়ে মাহফুজ আনাম ভুল কিছু করেননি। বরং তিনি অন্তত একটা বলবার পরিসর তৈরি করেছিলেন। যখন হাত-পা বন্ধ থাকে, আমাদের কর্তব্য হলো পরিস্থিতিটা অন্তত মানুষকে জানানো, সেটাই তিনি জানিয়েছিলেন। কিন্তু যতখানি জায়গা তৈরি করলেন কথা বলবার, তরুণতর গণমাধ্যম কর্মীদের সম্ভবত দায়িত্ব একটু ঝুঁকি নিয়ে হলেও সেই পরিসরটিকে আরও বিস্তৃত করা। কিন্তু মিডিয়ার নীতির প্রসঙ্গে মাহফুজ আনামের দেখিয়ে দেয়া এই গুরুত্বপূর্ণ দুটো অংশ– রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিগুলোর প্রতিপত্তি– গণমাধ্যমকে প্রভাবিত করেছে কি-না, সেই আলাপটিই উহ্য থেকেছে মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটিতে। ফলে তা পর্যবসিত হয়েছে নিতান্তই নাম প্রকাশ করবো কি না, নির্যাতনের বিবরণ কতটুকু প্রকাশ করা হবে ইত্যাদি গণমাধ্যমের আইনগত ও দায়িত্বশীলতার আলাপে, যদিও সেটা অগুরুত্বপূর্ণ নয়।

কিন্তু ওদিকে আমজনতার প্রশ্ন বলে যা বুঝতে পেরেছি, সেটা গণমাধ্যম নিজের দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে সচেতন বা অসচেতন কি-না, এমনটা একদমই না। মানুষ বরং আরও পস্ট করে জানতে চায় বিজ্ঞাপনের ভয়ে বসুন্ধরার নাম প্রকাশ করতে চায়নি গণমাধ্যম? পরবর্তীতে সামাজিক গণমাধ্যম তাদের কাউকে কাউকে বাধ্য করেছে নাম প্রকাশ করতে? আপাতদৃশে টাকা খেয়ে মুনিয়ার চরিত্র হননে নেমেছে কোনো কোনো গণমাধ্যম? এই সম্পাদকদের অন্য কোথাও চাকরির যোগ্যতা নাই বলে মুখ বুঝে সহ্য করছে এমন ভয়াবহ নোংরামি?

মানুষের প্রশ্ন যদি বলি, এগুলোই। স্বীকার করি, একটা দায়িত্বশীল পত্রিকার পক্ষে হয়তো মানুষের এই সব প্রশ্নগুলোকে একেবারে এইভাবে সোজাসাপটা তুলে ধরা সম্ভব না। কিন্তু এই প্রশ্নগুলোকে একদম এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক না। প্রশ্নগুলো ইতিহাসে অদৃষ্টপূর্বও নয়, গণমাধ্যমের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে এগুলো পড়িয়ে থাকেন।

২.

খেয়াল করুন পাঠক, আমরা সচেতনভাবে মুনিয়ার কথা লিখছি। ডেইল স্টার লেখেনি বা বলেনি। আমরা একইভাবে লিখেছিলাম তনু হত্যা কিংবা এর আগে আরও অনেকের কথা। আমরা কি এইভাবে ডেইল স্টারের মত বলতে পারতাম, গুলশানে নিহত কিশোরী হত্যার বিচার চাই? কুমিল্লায় নিহত কিশোরী হত্যার বিচার চাই? চট্টগ্রামে নিহত অমুক হত্যার বিচার চাই? কিংবা এক দুই তিন চার এমন সব সংখ্যায় দিয়ে প্রকাশ করতে পারতাম? মনে হয় পারতাম না। শিশু হলেও হয়তো তাদের নামই লিখতাম, এমন পরিস্থিতিতে। মামলার কারণে এই নামগুলো প্রকাশ্য তথ্যে পরিণত না হলেও হয়তো ঝুঁকি নিয়ে লিখতাম। কেননা, আইন যদি স্বাভাবিক থাকতো, কিছু আসতো যেতো না তাদের নাম ‘রোকেয়া বা রোকসানা’ তাতে, এমনিতেই হয়তো ন্যায বিচারের আশা আমরা করতে পারতাম।

কিন্তু যখন মানুষের মনে হতে থাকে বাঁচবার একমাত্র পথ, পিশাচদের আরও আষ্টেপৃষ্টে আমাদের বেঁধে ফেলা আটকাবার একমাত্র উপায় এই ঝরে যাওয়া নাম আরও বারংবার উচ্চারণ… তখন এই নামগুলোই তো আমাদের সম্বল।

ফলে এটা খুবই ঠিক, এটা একদমই দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন; বিচার এমনিতেই হলে আক্রান্তের পরিবারকে কেন আর বিব্রত করা, ঝুঁকির মাঝে ফেলা তাদের ক্ষত মনে করিয়ে দেয়া ওই নামগুলো বলে! কিন্তু পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী এই দায়িত্বশীলতার ব্যাকরণও বদলাতে বাধ্য। অপরাধের যিনি শিকার, তার নাম বাদ দেয়ার যৌক্তিকতা ছিল তিনি যেন আরও বেশি হয়রানি ও ঝুঁকির মাঝে না পরেন, এমনকি বিব্রত না হন। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রটিতে বরং এই মানুষগুলোকে অনামা করে ফেলতে পারলেই সম্ভাব্য অপরাধীর সাজা না পাবার সম্ভাবনা যাবে বেড়ে। ফলে মুনিয়ার পরিবারের বিব্রত হওয়াটা বুঝেও আমাদের তার নামটা বারংবার বলতে হবে। মুনিয়ার নামটা এই রাষ্ট্রের অবিচারের প্রতীক, যেমন তনু কিংবা বুশরা বা আরও অনেক প্রায় ভুলে যাওয়া নাম।

প্রেক্ষাপট যদি এমন হয় যে দায়িত্বশীল গণমাধ্যম নাম প্রকাশেও বিরত থাকলো, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো মাহফুজ আনামের ভাষাতেই সাধ্যমত অনুসন্ধান করলো না, তখনও কিন্তু মৃত মুনিয়া ও তার পরিজনেরা টাকা-খাওয়া এই সাংবিদকতার নৃশংসতা থেকে রেহাই পাবেন না। রেহাই তারা পাচ্ছেন না।

২. একটা পত্রিকার প্রথম পাতার একটা ছবি দিলাম লেখাটার সাথে, হয়তো ইতিমধ্যেই দেখেও ফেলেছেন সকলে। আমি মনে করি না এই পত্রিকার সকল কর্মী এই নৃশংস সাংবাদিকতার সমর্থক। এই রকম একটা সময়ে ব্যক্তিগতভাবে কোন গণমাধ্যমকর্মীর প্রতি প্রতিহিংসাপরায়নও আমরা হতে চাই না। রাজনৈতিক মোসাহেবিপনার নীচতাকেও আপাতত ভুলে যাওয়া যেতে পারে এই রকম ন্যূনতম মানবিক প্রশ্নে। তাই এই রকম পত্রিকাগুলোতে যারা চাকরি করতে বাধ্য হন, তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত না করেই (কিন্তু চাই তারা আরও বেশি বিবেকের দংশন অনুভব করুন) বিষয়টা নিয়ে কথা বলা যাক। একটাই প্রশ্ন: এমন পত্রিকাগুলোর উর্ধতনরা কি দায়িত্ব এড়াতে পারেন এমন প্রতিবেদন বিষয়ে?

ভারতের মত দেশেও দেখেছি, কৃষক আন্দোলন নিয়ে সংবাদ করতে দেয়া হয় নাই বলে গণমাধ্যম কর্মী পদত্যাগ করেছেন। সারা দুনিয়াতে এমন ঘটনার অভাব নেই। ভারতে একজন গণমাধ্যম কর্মীর ঝুঁকির অভাব নেই। সঙ্কটের অভাব নেই। বাংলাদেশে এই পৈশাচিক সংবাদিকতার দৃষ্টান্তের পরও যখন একটা দুটো পদত্যাগ দেখি না, তখন প্রশ্ন জাগে এরা কি এতই অক্ষম যে এই পত্রিকা ছাড়লে তাদের আর ভাত জুটবে না? ভাতের জন্য এত নিচে নামতে হবে? বাংলাবাজারে বাংলা বানান দেখলেও ডাল-ভাতের খাওয়া জোটে, এইটুকু কাজই তো আসলে এইসব পত্রিকাতে করে থাকেন, বাকিটা বসুন্ধরার প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে চলে যায়। এই রকম একটা পদত্যগের দৃষ্টান্ত সমাজের সার্বিক অধঃপতনের গাড়িটাকে থামায় না বটে, কিন্তু অন্তত গতিটাকে কমিয়ে আনে। ভারতের কৃষক আন্দোলেনের শুরুতে কর্পরেট গণমাধ্যমের একটা বড় অংশই ছিল কৃষকদের বিরুদ্ধে। এখন তারা অনেকটাই সুর নরম করেছে। বিনা উদ্যোগে কি কর্মস্থলের পরিবেশ বদলাতে পারবেন? শুধু চাপের দোষ দিয়ে আর কতদিন? কতকাল? এরপর সন্তানদের সামনে কোন মুখে হাজির হওয়া যায়! মানুষের সামনে কিভাবে দাঁড়ানো যায়!

আমাদের গণমাধ্যম আসলে দৃষ্টান্তশূন্য হয়ে পড়েছে। ঝুঁকি না নিতে নিতে, মেনে নিতে নিতে গণমাধ্যমের সংস্কৃতি এত বিষাক্ত হয়ে গেছে যে আপাতত এখানে কিছুই আশা করতে পারছি না।

অজস্র দোষত্রুটি সত্ত্বেও সামাজিক গণমাধ্যমই তাই এখন যা কিছু ভরসা; টাকা খেয়ে লেখা, কিংবা বিজ্ঞাপন খেয়ে নীরব থাকা গণমাধ্যমের যুগে এই নতুন মাধ্যমের চাপে তাপে .পে মানুষ দুচারটা কথা জানতে পারছে, বলতেও পারছে। কারণ বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যমই গণমাধ্যমের এই্টুকু পর্যালোচনা প্রকাশ করার মত, এমনকি আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে নিজেরাই আত্মসমালোচনা কররবার মত পরিশীলিত বা সভ্য হয়ে ওঠেনি এখনো। 

লেখকঃ বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠক এবং কলামিস্ট

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

four × four =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা