28 C
Dhaka
রবিবার, আগস্ট ১, ২০২১

চা উপাখ্যান

যা পড়তে পারেন

:: হুমায়ূন কবির ::

আমার একাধিক চা পোস্টে চা প্রিয় কতিপয় বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ব্ল্যাক টি, না গ্রীন টি- কোনটা বেশি উপকারী?”ভেবে দেখলাম, সরাসরি উত্তর না দিয়ে এখানে খানিকটা জ্ঞান চর্চা করলে মন্দ হয় না। 
গল্প আছে, সুদূর অতীতে – আজ থেকে মোটামুটি ৪৭৭০ বছর আগে – একদল চিনা সেনা তাদের কমাণ্ডার শেন নুং সহ – শত্রুদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে এক জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে তারা জঙ্গলের কাঠকুটো সংগ্রহ করে সেগুলো জ্বালিয়ে তার চারদিক ঘিরে বসে শরীর গরম করছিলো। তার উপর গরম করছিলো তাদের খাওয়ার পানিও। সেই পানিতে পড়েছিল নিকটবর্তী গাছের কয়েকটা পাতা। ফোটানো পানি পান করে শেন নুং চমৎকৃত হলেন। এর স্বাদ, এর গন্ধ বেশ সুন্দর ও সর্বোপরি এই পানি পান করে তিনি বেশ চনমনে ভাব অনুভব করলেন। চিনাদের সংকলনে এই গল্পটাকেই চা পাতার আবিষ্কার হিসাবে বর্ণনা করা আছে।   
ফলত চা-গাছের যখন বৈজ্ঞানিক নামকরণ হল, ক্যামেলিয়া সাইনেনসিস। সাইনেনসিস মানে চিনে-উৎপন্ন। বহুযুগ ধরে মূলত চিনে ও বৌদ্ধধর্ম প্রচারের কারণে দুরপ্রতিবেশী জাপানে চা-পান চালু ছিল কেবল ওষধি হিসাবে। বিশ্বের দরবারে একে জনপ্রিয় করে তোলে ইওরোপিয় পর্তুগিজ/ ওলন্দাজ এবং ব্রিটিশরা। চিনের মনোপলি খর্ব করতে আফিমের বদলে সেখান থেকে চা-গাছ এনে রোপণ করা হয় ভারতে। অচিরেই ভারত হয়ে ওঠে পৃথিবীর একনম্বর চা-উৎপাদক। পরে চিন অবশ্য তার হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করে এখনও এক নম্বরে, তারপরে ভারত, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, ইত্যাদি। ব্রিটিশ-ওলন্দাজ কোম্পানি ইউনিলিভার তাদের ব্রুকবন্ড-লিপ্টন-পিজিটিপ্স-আদি ব্র্যান্ড নিয়ে ছিল পৃথিবীর এক নম্বর চা-কোম্পানি চিন থেকে। পরে কেনিয়া থেকে টেটলি নামের এক জনপ্রিয় ব্র্যান্ড কিনে ইউনিলিভারকে টেক্কা দেয় ভারতীয় কোম্পানি, টাটা টি। বর্তমানে এই দুইয়ের বিশ্বজোড়া প্রতিযোগিতা, কখনও এ ওকে ছাপিয়ে যায়, কখনও ও একে! আমার পছন্দ টেটলি গোল্ড ব্রান্ড। 
বেইজিং অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরিচালক ঝ্যাং ইমাউ পরিচালিত এক থিয়েটার শো দেখেছিলাম, নাম “ইমপ্রেশন ডা-হোং-পাও”। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা! ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে-পারা ২০০০-সিটের দর্শকাসনের টিকিট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার হলেও আমার চাইনিজ বিজনেস প্রিন্সিপাল মিঃ রিচার্ড ওয়াং আমাকে ট্রিট দিয়েছিলেন। চারদিকে চারটি স্টেজ, বিশাল সাইজের দর্শকাসন ঘুরে ঘুরে এক এক সময় এক এক স্টেজের সামনে এনে ফেলে। ফলে কখনও সামনে দেখা যায় একটা তিনতলা রাজবাড়ি যাতে তিনটে তলার এক এক ঘরে একযোগে অভিনয় করছে প্রায় শ’ খানেক অভিনেতা, কখনও এক চা-বাগান যাতে চা তুলতে তুলতে নাচছে গাইছে একযোগে শ’ খানেক তরুণী, কখনও এক বিশাল লেক যাতে ভাসমান খান বিশেক বড় বড় নৌকায় একযোগে অভিনয় চলছে। থিয়েটার চলার মাঝে মাঝে ঐ চা-বাগানের চা স্টেজে সার্ভ করে যাচ্ছে কেউ। চিনে চা-ঐতিহ্যের ইতিহাস হচ্ছে সেই নাটকের প্রতিপাদ্য। সে সব লিখতে গেলে গ্রীন-টি ব্ল্যাক-টি’র কথা বলাই হবে না। এই বিষয়ে আমি ২০০৮ সনে বিস্তারিত লিখেছিলাম ১২ পর্বের চিন ভ্রমণ পোস্ট। 
ঐ ডা-হোং-পাও হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা। ঐ চা এক কেজি নাকি নিলামে বিক্রি হয়েছে এক মিলিয়ন আমেরিকান ডলারেও, মানে আমাদের সাড়ে আট কোটি টাকায়!  
ভাস্কো-ডা-গামা কালিকট বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোর পর থেকে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ভারতে আসার ইওরোপিয়ান জলপথ চালু হয়ে গেল। তারাই ঘুরে ঘুরে পৌঁছে গেল চিনে, চা কিনে নিয়ে গেল ইওরোপে। ওলন্দাজরা এল তারপর, তারা বাণিজ্যে উৎসাহী, চিনের চা বিক্রি করতে লাগল ইওরোপে চড়া দামে। ব্রিটিশ যুবরাজ দ্বিতীয় চার্লসের সঙ্গে বিয়ে হল পর্তুগিজ রাজকন্যা ক্যাথরিন অভ ব্র্যাগাঞ্জার যার চায়ের নেশা প্রবল। বিয়েতে পর্তুগিজরা যুবরাজকে যৌতুক দিল বোম্বে দ্বীপসমূহ, তারা তখন গোয়ায় জাঁকিয়ে বসেছে। ব্রিটিশ যুবরাজ রাজা হয়ে ভেবে দেখলেন, এই ছাতার দ্বীপ দিয়ে হবে-টা কী, নামমাত্র মূল্যে তিনি তা প্রায় দান করে দিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে। সেই বোম্বে দ্বীপ এখন ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বই নগরী। ক্যাথরিন অভ ব্র্যাগাঞ্জা ব্রিটেনের রাজপরিবারে ও তদ্দ্বারা অন্যান্য ধনী পরিবারে চালু করলেন ‘বেড টি'(রাতভর ঘুমিয়ে হাতমুখ না ধুয়ে বাসি মুখে চা খাওয়ার নোংরা রীতির নাম ‘বেড টি’! ছিঃ) তারপর সভ্যতায় এলো ‘ব্রেকফাস্ট টি’। বেডফোর্ডের ডাচেস অ্যানা রাসেল দেখলেন বিকেলে কেক- বিস্কুট বা স্যান্ডুয়িচের সঙ্গে এক কাপ দার্জিলিং চা হলে একটা স্বর্গসুখের অনুভূতি হয়। ব্যাস, চালু হয়ে গেল ‘ইভনিং টি’। 
চায়ের বাজার খুলে গেল সারা বিশ্বে। চা চলে গেল আমেরিকায়, শুরু হল ‘বস্টন টি পার্টি’। তারই জের ধরে স্বাধীনতা পেয়ে গেল আমেরিকা, ব্রিটিশ উপনিবেশের হাত থেকে। চোরাচালান ও বেআইনি চা-ব্যবসা চালু ছিল বহুযুগ, অত্যধিক সরকারি ট্যাক্সের কারণে। সরকার ট্যাক্স কমালে টমাস লিপ্টন নামে এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী চা-কে সাধারণ মানুষের আওতায় এনে দেন(সেই জন্যই আজ আমার মতো গরীবও চা খাওয়া রোগে আসক্ত)। এর আগে নিউ ইয়র্কের ব্যবসায়ী টমাস সুলিভান তার ধনী ক্রেতাদের মনোরঞ্জনের জন্যে চা বিক্রি করছিলেন ছোট ছোট সিল্কের পুঁটলিতে বেঁধে। ক্রেতারা না বুঝে পুঁটলিসমেত সেই চা গরম পানিতে ডুবিয়ে দিতে অনভিপ্রেতভাবেই আবিষ্কৃত হয়ে গেল ‘টি-ব্যাগ’! 
চা বাগানে গুল্মপ্রকৃতির যে উদ্ভিদগুলি আপনারা দেখেন, ওদের প্রত্যেকটি যদিও সুউচ্চ বৃক্ষ হিসাবে আত্মপ্রকাশে সক্ষম, মানুষ তার ক্ষুদ্র স্বার্থে ওদের ক্রমাগত ছেঁটে ছেঁটে অনুচ্চ বুশ বা ঝোপ বানিয়ে রাখে। সে হিসাবে প্রতিটি চা-গাছ এক একটি বনসাই! 
ও হ্যাঁ, আর একটা কথা -প্রসঙ্গত বলে রাখি, কসমেটিক্সে, বিশেষ করে উজ্জ্বল ত্বকের আশ্বাস দেওয়ার কিছু ক্রিমে উপাদান হিসাবে ‘টি ট্রী অয়েল’ (tea tree oil) নামে যে বস্তুটি দেখে থাকবেন, তার সঙ্গে চা-গাছকে গুলিয়ে ফেলবেন না। ওটি চা-গাছের তেল নয়।
“ধান বানতে শিবের গীত” গেয়ে ফেলেছি অথচ অরিজিনাল প্রসঙ্গেই আসা হল না। তবে ফেসবুকে একসঙ্গে বেশি লিখলে পাব্লিক বিরক্ত হয়, তাই আপাতত এইটুকু থাক। উত্তরটা পরের পর্বে…. 
চায়ের প্রতি আমার আকর্ষণ আর কৌতূহল মেটাতে আমি জীবনে তিনটি চা বাগানে তিন দফায় মোট তিন মাস সরেজমিন বাগানে থেকে চা প্রকৃয়া প্রত্যক্ষ করেছিলাম! এছাড়াও চিনের একাধিক চা বাগানে চা প্রস্তুত প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছি।
জেনে অবাক হবেন, ব্ল্যাক টি আর গ্রীন টি একই গাছের পাতা থেকে তৈরি। শুধু ব্ল্যাক বা গ্রীন নয়, হোয়াইট টি, উলং টি, আইস টি ইত্যাদি যাবতীয় চা সবই প্রধানত ওই ক্যামেলিয়া সাইনেনসিসের দুটি পাতা একটি কুঁড়ি থেকেই তৈরী। (চারটি পাতার চা হয়, যা দিয়ে লাশ সংরক্ষণ করা হয়)। অবশ্য এখন বিভিন্ন ফুলগাছের শুকনো ফুল দিয়ে যে চা তৈরী হয় তার নাম’ফ্লোরাল টি’। ফ্লোরাল টি এই আলোচনায় আনছি না। আমরা সীমাবদ্ধ থাকব ব্ল্যাক আর গ্রীন টি-তেই যেহেতু আমাদের দেশে প্রধানত এই দু’ রকম চা-ই লোকে খায়। 
এই ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ চা-বাগান থেকে তুলতে (‘হারভেস্ট’) যাদু রাম বংশধরদের পিঠের ঝুড়িতে জমা হওয়া চা-পাতা থেকে এ কাহিনির শুরু, যার শেষ বাক্সবন্দী হওয়া ব্ল্যাক বা গ্রীন টি তৈরিতে। 
বৃটিশ ভারতে তথা উপমহাদেশে যাদুরাম পরিবার প্রথম চা শ্রমিক পরিবার। এই যদুরাম বহু দুখী মিনি-দের কামিন বানিয়ে নিয়ে গেছিল ‘অছম দেছে’। চা শ্রমিকদের ওপর অত্যাচারের হাহাকার মিশে আছে চা শ্রমিক লোকসঙ্গীতে – “বাবু বলে, কাম কাম / ছর্দার বলে, ধরে আন / ছাহেব বলে, লিব পিঠের চাম! / রে যদুরাম, ফাঁকি দিয়া পাঠাইলি অছম”। 
চা-পাতা ভর্তি ঝুড়িগুলো চলে আসে চায়ের কারখানায়। ডাঁই হয় টিলার মত স্তূপে। ওভাবেই পড়ে থাকে, রোদ- ছায়ায়। উদ্দেশ্য পাতাটাকে একটু শুকিয়ে নেওয়া। ডাঁই অবস্থায় পাতাগুলো তখনও ‘জীবন্ত’ এবং এর কোষে কোষে তখনও বিপাকীয় ক্রিয়া চলছে। ব্ল্যাক টি-র ক্ষেত্রে এইভাবে ফেলে রাখা হয় ১২-১৮ ঘন্টা, পাতায় পানির পরিমাণ যাতে ৫০-৭০% কমে যায়। গ্রীন টি-র ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ২-৪ ঘন্টা, কেননা বেশিক্ষণ ফেলে রাখলে ক্লোরোফিলের সবুজ নষ্ট হয়ে যায়। এই ফেলে রাখাকে বলা হয় ‘উইদারিং’। 
পরবর্তী স্টেপের নাম ‘ম্যাসারেশন’, অর্থাৎ পাতাটা মেশিনে ছেঁড়াছিঁড়ি করা। এর ফিজিক্যাল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট আকৃতি দেওয়া আর কেমিক্যাল উদ্দেশ্য হচ্ছে পাতার বিভিন্ন ধরণের কোষে আলাদা আলাদা যে রাসায়নিক পদার্থগুলো আছে সেগুলো কোষের দেওয়াল ভেংগে বিভিন্ন মাত্রায় পরস্পরের সঙ্গে মিশতে দেওয়া যাতে তাদের মধ্যে বিক্রিয়া হয়ে তৈরি হতে পারে চায়ের গন্ধ, রং, স্বাদ। এই ছেঁড়াছেঁড়ির মধ্যে আছে রোলিং বা গোল পাকানো, ব্রুইশিং অর্থাৎ আঁচড়ে দেওয়া, ক্রাশিং বা কুচিকুচি করে গুঁড়ানো। রোলিং মানে পাতার গায়ে হাত বোলানো, তাতে কোষের ভেতরের জিনিস তেমন মিশতে দেওয়া হয় না। ব্রুইশিঙে তার চেয়ে বেশি, ক্রাশিঙে আরও বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতির নাম ক্রাশ-টিয়ার-কার্ল অর্থাৎ কাটো-ছেঁড়ো-গোল্লা পাকাও। একেই আমরা ‘সি-টি-সি’ বলে জানি। 
এর পরের ধাপকে চা-ইন্ডাস্ট্রিতে বলা হয় ‘ফার্মেন্টেশন’। ফার্মেন্টেশনে রাসায়নিক পরিবর্তন করে জীবাণু-নিঃসৃত এনজাইম। এনজাইমটা চা-পাতার মধ্যেই থাকে। এই এনজাইমের প্রভাবে চা-পাতার পলিফেনল, মানে ‘ক্যাটেকিন্স’ (ক্যাটেকিন, এপিক্যাটেকিন, এপিক্যাটেকিন গ্যালেট বা ECG, এপিগ্যালোক্যাটেকিন বা EGC এবং বিশেষ করে এপিগ্যালোক্যাটেকিন গ্যালেট বা EGCG) ‘পলিফেনল অক্সিডেজ’ নামের এনজাইমের প্রভাবে বাতাসের অক্সিজেনে oxidized হয়ে বিভিন্ন রাসায়নিক বস্তু তৈরি করে। 
এই ব্যাপারটা আর একটু বুঝিয়ে বলিঃ- মনে করুন আপনি আলু অথবা কাঁচকলা কেটে বা আপেল, পেয়ারা কামড়ে একটু খেয়ে রেখে দিলেন। দেখবেন একটু পরেই ওর গায়ে কালো কালো দাগ হয়ে গেছে। কাটার বা কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু হয়নি, অর্থাৎ যখন জিনিসটা গোটা ছিল, ভেতরে সাদাই ছিল। কাটা বা কামড়ানোর ফলে এদের কোষের দেওয়াল আপনি ছেৎরে দিলেন বলে তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল এদের মধ্যে উপস্থিত পলিফেনল ও এনজাইম পলিফেনল অক্সিডেজ। বাতাস লেগে পলিফেনল ঐ এনজাইমের প্রভাবে অক্সিডাইজ হতেই তাদের রং কালো হয়ে গেল। এই পলিফেনল ও পলিফেনল অক্সিডেজ এরা দুটোই এদের মধ্যে ছিল, হয় আলাদা ধরণের কোষে অথবা একই কোষের মধ্যে আলাদা প্রকোষ্ঠে। এগুলোকে অনেকে আয়রন বা লোহার উপস্থিতি বলে ভুল করে। চা-পাতাতেও এই পর্যায়ে ঠিক সেই ঘটনাটাই হয়। 
এর পর ‘ড্রায়িং’ অর্থাৎ শুকানো হয় বিশাল অভেনে অথবা গরম হাওয়ায়। এই পর্যায়ে অনেক রকম রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়, সে শুনে কাজ নেই। চা-পাতায় উপস্থিত শর্করা ক্যারামেলাইজড হয়, তার ‘রোস্টেড নাটি’ অ্যারোমা যুক্ত হয় চায়ের রং হয় বাদামী। চায়ের প্রোটিনের অ্যামাইনো অ্যাসিডের সঙ্গে শর্করার ‘মেয়ার্ড রিয়্যাকশনে’ তৈরি হয় একগুচ্ছ রাসায়নিক। এনজাইমগুলো এই গরমে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। স্বাদ-বর্ণ-গন্ধদায়ী অধিকাংশ পদার্থ এই স্টেজেই তৈরি হয়। 
যে জিনিসটা তৈরি হল, তাকে এবার প্যাকেটে ভরলেই হয়। কিন্তু সাধারণত তা করা হয় না। টি-টেস্টারের নাম আপনারা শুনেছেন, বিরাট অংকের বেতন নিয়ে যারা চায়ের ব্যাপারে ফাইনাল টাচ দেন তাদের কাজ হচ্ছে ব্লেন্ডিং। এই লাইনের এত কেজির সঙ্গে ঐ লাইনের অত কেজি মেশালে সেটা হবে ‘তাজমহল’ চা, ওটার অত কেজির সঙ্গে সেটার তত কেজি মেশালে ‘রেড লেবেল’, ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা একটা আর্ট যা রপ্ত করতে একজন কোয়ালিটি ফিনিসারকে অনেক গবেষণা আর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। 
তাহলে কোনটা গ্রীন টি আর কোনটা ব্ল্যাক? 
গ্রীন টি-তে ফার্মেন্টেশন স্টেপটা পুরো বাদ দেওয়া হয় (যদি অল্প সময় ধরে ফার্মেন্টেশন করা হয়। তবে যেটা তৈরি হয়, তার নাম উলং টি! এবং ম্যাসারেশনের সময় যাতে ফার্মেন্টেশন না হয়, তার জন্যে খুব অল্প সময়ের জন্যে (মিনিটখানেক) উচ্চ তাপমাত্রায় রেখে এনজাইমকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। 
এর মানে গ্রীন টিতে থাকে চা-পাতায় থাকা পলিফেনলগুলো প্রায় অবিকৃত অবস্থায়। সেগুলো অক্সিডাইজ তেমন না হতে পারার কারণে গাঢ় রং তৈরি হতে পারে না। এর অ্যারোমাও অনেকটা হাল্কা ‘গ্রাসি গ্রীন ফ্রেশ’ যেখানে ব্ল্যাক টিতে ফার্মেন্টেশন ও তৎপরবর্তী ড্রায়িং স্টেপে গাদাখানেক বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হয় বাদামী লাল রং, অক্সিডাইজড পলিফেনল এবং ফ্লাওয়ারি-উডি-নাটি অ্যারোমার ককটেল। 
বুঝতে পারছি আপনাদের অধৈর্য্যের মাত্রা কোন পর্যায়ে! কাজেই এবার উত্তরটা দিয়ে দেওয়াই উচিত। 
না, আর একটু বাকি আছে। বিভিন্ন প্রকৃয়ার মাধ্যমে চা পাতায় কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া তৈরী হয়। যেমন,  ক্ষারীয় পাইরোগ্যালেট হচ্ছে পাইরোগ্যালল আর ক্ষারের মিশ্রণ আর পাইরোগ্যালল হচ্ছে গ্যালিক অ্যাসিড নামের এক যৌগের থেকে (কার্বক্সিলিক) অ্যাসিড গ্রুপ বাদ দিলে যা হয় বেঞ্জিন রিং। হাইড্রক্সিল গ্রুপ (-OH) লাগানো জিনিসটাই পাইরোগ্যালল। বেঞ্জিন রিঙের সঙ্গে হাইড্রক্সিল মেশালে যা হয় তার নাম ফেনল (অথবা কার্বলিক অ্যাসিড। কাজেই বেঞ্জিন রিঙে একাধিক হাইড্রক্সিল থাকলে তাকে পলিফেনল বলা হয়। পাইরোগ্যালল, গ্যালিক অ্যাসিড সবই পলিফেনল। 
এই পলিফেনলগুলো হচ্ছে রিডিউসিং কম্পাউন্ড। গ্যালো- ছাড়া যে ক্যাটেকিন অংশ, তাদের বলা হয় ফ্ল্যাভানয়েডস, তারাও পলিফেনল এবং রিডিউসিং কম্পাউন্ড। এ জন্যেই এরা শরীরের পক্ষে উপকারী। এদের বলা হয় অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টস। আমাদের শরীরকে রক্ষা করে ক্ষতিকর ‘রিয়্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিসের’ হাত থেকে।
এইটা আর একটু গুছিয়ে না বললে গ্রীন-ব্ল্যাক টি-র কোনটা ভাল, তার উত্তরটা দেওয়া হবে কিন্তু আমার তৃপ্তি হবে না। তাই আর একটা দিন অপেক্ষা করুন, প্লিজ। 
এইবার আর বেশি ধানাই-পানাই না করে উত্তরে চলে আসি। তো কোশ্চেনটা ছিল – গ্রীন টি না ব্ল্যাক টি শরীরের পক্ষে ভাল? 
বুঝতেই পারছেন, এ জন্যে জানতে হবে এ দুটোর মধ্যে কী কী আছে, তাদের কোন জিনিসটা ভাল এবং কেন ভাল। সেটা জানলেই তো সব গণ্ডগোল মিটে যায়। 
এতক্ষণ যা বললাম, তাতে মোটামুটি বুঝে গেছেন যে গ্রীন টি মানে গাছের পাতারই মোটামুটি ড্রাই ফর্ম। উইদারিং-ড্রাইং-এ অল্পস্বল্প রাসায়নিক ক্রিয়ায় তাতে উৎপন্ন হয় খানিকটা গন্ধ ও বর্ণ, বাকিটা পাতাতে যা থাকে প্রায় তাই-ই। সেখানে ব্ল্যাক টি-তে বেশ অনেকটা পরিবর্তন হয় ফার্মেন্টেশন স্টেপটার জন্যে, যেখানে এনজাইম আর অক্সিজেন চায়ের পলিফেনলগুলোকে অক্সিডাইজ করে অন্য জিনিস তৈরি করে। 
ওই অন্য জিনিসগুলো সম্বন্ধে চট করে দু-কথা না বললে পরে বলবেন, বলিনি। তাই বলে দিই, যেমন গ্যাস্ট্রো- মানে পাকস্থলির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, কার্ডিও- মানে হার্টের সঙ্গে, সেই রকম থিয়া- (thea-) মানে চায়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বস্তু। চা-পাতায় যেমন থাকে ক্যাটেকিন্স নামে কয়েকটা পলিফেনল, যেগুলো স্বাভাবিকভাবেই গ্রীন টি-তে থেকে যায়, সেগুলো এনজাইমের প্রভাবে অক্সিডাইজ হয়ে তৈরি করে প্রধানত দু-ধরণের রাসায়নিক পদার্থ। একটার নাম থিয়াফ্লেভিন্স আর একটা থিয়ারুবিজিন্স। ক্যাটেকিনগুলোর মধ্যে যেমন গ্যালো- আর গ্যালেট লেগে থাকতে পারে, এদেরও তাই। থিয়াফ্লেভিন তৈরি হয় একটা ক্যাটেকিন অক্সিডাইজ হয়ে আর একটার সঙ্গে জুড়ে সামান্য পরিবর্তিত হয়ে। এই থিয়াফ্লেভিনগুলোর রং হচ্ছে কমলা বা কমলা-লাল, যে ব্ল্যাক টি-তে যত বেশি থিয়াফ্লেভিন তার রং তত বেশি লালের দিকে (দুধ না দিয়ে চা করলে)। কিন্তু এনজাইমের বিক্রিয়া তো চট করে কন্ট্রোল করা যায় না, তাই অক্সিডাইজড ক্যাটেকিন অনেকগুলো হুড়মুড় করে একে অন্যের সঙ্গে লেগে গিয়ে বড়সড় যৌগও তৈরি করে, তাদের একসঙ্গে বলা হয় থিয়ারুবিজিন্স। এদের রং থিয়াফ্লেভিন্সের মত অত মনোহারি নয়, বাদামীর দিকে। ব্ল্যাক টি-র রঙের ও স্বাদের জন্যে এই থিয়ারুবিজিন্সের অবদানই সর্বাধিক। 
চা যখন বাড়িতে বানানো হয়, অর্থাৎ ব্রু (brew) করা হয়, তখন আপনি কিছুটা পরিমাণ চা পাতা পানিতে দিয়ে ফোটান। চা পাতা না নিয়ে টি ব্যাগও নিতে পারেন। প্রতিটি টি ব্যাগে দু-গ্রাম চা পাতা থাকে। এবং ওই দু গ্রাম থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ মিলিগ্রাম গরম পানিতে গুলে যায়। ব্ল্যাক টি-র তুলনায় গ্রীন টি-তে একটু বেশি গোলা উচিত, যেহেতু ওতে উপস্থিত কম্পাউন্ডগুলো ছোট ছোট এবং জলে সুদ্রাব্য। কিন্তু গ্রীন টি-তে পাতাটা যেহেতু ব্ল্যাক টি-র মত অতটা ‘ম্যাসারেট’ করা হয় না, তাই গড়পড়তা প্রায় সমান পরিমাণই পানিতে গোলে। 
এবং ঐ ৮০০ মিলিগ্রামের প্রায় অর্ধেকই পলিফেনল। গ্রীন টি হলে ক্যাটেকিন্স, যাদের সিংহভাগ ঐ EGCG, ব্ল্যাক টি হলে তাদের অক্সিডাইজড ক্যাটেকিন্স যাদের সিংহভাগ ঐ থিয়ারুবিজিন্স। চায়ের যে কষ-কষ স্বাদ, তার প্রধান কারণ এই পলিফেনলগুলো। এই স্বাদকে বলে অ্যাস্ট্রিনজেন্ট। জাম খেলে যে কষ-কষ স্বাদের সঙ্গে জিভে একটা লেয়ার পড়ে যায়, এই দুটো ব্যাপার (স্বাদ আর লেয়ার পড়া) সম্পর্কিত। যে জিনিস জিভের ওপর বেশি বেশি করে লেয়ার ফেলে, সে তত বেশি অ্যাস্ট্রিনজেন্ট।
এ ছাড়াও থাকে ২-৫% ক্যাফিন, যা আপনাকে দেয় একটু কিক, যার ফলে আপনার চায়ের নেশা তৈরি হয়। এবং বেশ খানিকটা অ্যামাইনো অ্যাসিড, যাদের মধ্যে এল-থিয়ানিন চায়ের এক বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে। এই এল-থিয়ানিন জিনিসটা রক্তের সঙ্গে মিশে ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার নামের গেইট পেরিয়ে চলে যায় মস্তিষ্ককোষে এবং সেখানে তৈরি করে ‘আলফা ওয়েভ’ নামে এক বিচিত্র বস্তু, যার ফলে আপনি ‘রিল্যাক্সড অ্যালার্টনেস’ অনুভব করেন। চা-পানের আনন্দের কারণ এটাই। 
যেহেতু মোট পলিফেনলের পরিমাণ এক এবং শরীরের কোষে তাদের রিয়্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস (বা ROS) তাড়ানোর ক্ষমতাও প্রায় একই, তাই গ্রীন টি আর ব্ল্যাক টি শরীরের পক্ষে একই রকমের উপকারী। উন্নত বিশ্বে এ নিয়ে বহু পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে, তবে এদের মধ্যে বিশেষ পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। 
আপাতত এটুকু বলা যেতে পারে, চা পান শরীরের পক্ষে ভাল। অজস্র প্রমাণ পাওয়া গেছে যে এর পলিফেনল দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং তা বিপাকীয় কার্যাদিতে সাহায্য করে। ব্ল্যাক টি, গ্রীন টি দুটোই ভাল। চিনদেশে ওরা যে গ্রীন টি পছন্দ করে, তাদের পাতাগুলো ছোট ছোট। ওরা যখন চা খায়, তখন পাতা ছেঁকে ফেলে দেয় না। চায়ের কাপের মধ্যে চা-পাতা দিয়ে তার মধ্যেই কেটলি থেকে গরম পানি ঢেলে দেয়, খাওয়ার সময় কাপের মধ্যেই চা-পাতাগুলো থাকে। ওপরের ‘চা’ কমে গেলে সেই কাপেই ক্রমাগত তাতে গরম পানি ঢেলে ঢেলে (প্রায় বার সাতেক) তার নির্যাস খেতে থাকায় একই পাতা থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি পরিমাণ ক্যাটেকিন্স খায় আমাদের তুলনায়। আমাদের অভ্যাস পাতা ছেঁকে ফেলে দেওয়া, তাই আমরা চায়ের পাতার পুরো নির্যাসটা পাই না। 
চায়ের মধ্যে দুধ আর চিনির ব্যবহার নিয়ে কিছু লিখিনি ইচ্ছে করে। এরা ভাল না খারাপ তা নির্ভর করে যে খাচ্ছে তার শারীরবৃত্তীয় অবস্থার ওপর। যার শরীরে ক্যালসিয়ামের বা প্রোটিনের অভাব, যার এনার্জি দরকার, তার পক্ষে দুধ-চিনি তো দরকারই। যাদের সে অভাব নেই, তারা পরিহার করতে পারেন। 
চা নিয়ে সৃজনশীল হতে পারেন। তৈরি করুন রকমারি চা। লেবু চা, আদা চা, এলাচ চা, মশলা চা যেমন আছে, তেমন তৈরি করুন চা-ভিত্তিক রকমারি পানীয়। ঢালুন আপনার ম্যাজিক মশলা, পুদিনা, মধু, দারচিনি, দুধের ক্রিম, ডাবের পানি- যেমন মন চায়। দেখুন কোনটা খেতে ভাল লাগছে। খেয়াল করবেন গরম চা ঠান্ডা হয়ে গেলে চায়ের কাপের নীচে জমা হয় থকথকে টি ক্রিম। ওটা হচ্ছে পলিফেনল আর ক্যাফিনের এক যুত-যৌগ যা ঠান্ডায় পানিতে গুলে থাকতে পারে না। তবে এরা লেবুর অ্যাসিডে গুলে যায়। এ জন্যেই আইস-টি প্রধানত অ্যাসিডিক লেবু-চা। 
নিয়মিত পরিমিত চা-পান শরীরের পক্ষে ভাল। একত্রে চা-পান পারিবারিক বন্ধনের পক্ষে ভাল। অতিথি সৎকারে চায়ের তুলনা নেই। এসব আপনারা জানেন। গ্রীন টি আর ব্ল্যাক টি শরীরের পক্ষে একই রকমের উপকারী হলেও গ্রীন টি আমাদের শরীরে বেশী ধারণ করতে পারে কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই। গ্রীন টি হার্ট ফেইলুওর বা উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে  কাজ করে। আলঝেইমার্স ডিজিস সংশ্লিষ্ট প্লাক সৃষ্টিতেই বাধা দেয়।
ও হ্যা, বলতে ভুলেই গিয়েছি, যারা মনে করেন “চা খেলে গায়ের রং কালো হয়ে যায়”- তাদের ধারণা সম্পুর্ণ ভুল। প্রমাণ, চীনা আর জাপানীরা সবচেয়ে বেশী চা পান করে অথচ ওদের কেউ কালো নয়। আবার আফ্রিকা মহাদেশীয় লোকেরাই সবচেয়ে কম চা পান করে -ওদের গায়ের রং আমার চেয়েও কালো! 
আপনি কি জানেন, পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে পঁচিশ হাজার কাপ চা পান করা হয়। প্রতিদিন ২১৬ কোটি কাপ!

তথ্যসূত্রঃ

* The Book of Green Tea: by Diana Rosen
* The big book of Green Tea – Green tea history, different types of green tea, health benefits, how to brew green tea properly and 25 health boosting green tea recipesby Infinite Health.

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

six − 4 =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা