30 C
Dhaka
শনিবার, জুলাই ৩১, ২০২১

জেমস বন্ডের হ্যান্ডগান

যা পড়তে পারেন

:: হুমায়ূন কবির ::

“God created men, but Colt made them equal.”
পিস্তলের ব্যবহার আমরা আখছাড় দেখতে পাই সিনেমা থেকে শুরু করে পুলিশ বা অন্য সিকিউরিটি সার্ভিসের হাতে। পিস্তল হচ্ছে এক ধরনের হ্যান্ডগান বা আগ্নেয়াস্ত্র যা একহাত অথবা দুইহাতে ধরে ফায়ার করা যায়। এর ডিজাইনের বৈশিষ্ট্য একে রাইফেল বা শটগান জাতীয় অন্যান্য মাঝারী বা হেভি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে আলাদা।


হ্যান্ডগানের কতগুলো ভাগ আছে। রিভলভার এবং পিস্তল তাদের মধ্যে অন্যতম। আবার পিস্তলের ভাগ হচ্ছে সিঙ্গেল শট পিস্তল, সেমি অটোমেটিক পিস্তল আর মেশিন পিস্তল। শব্দগত দিক থেকে “পিস্তল” এবং “হ্যান্ডগান” প্রায় একই অর্থবহ। যদিও অধিকাংশ হ্যান্ডগান দুই হাতে ধরে ব্যবহার করতে হয় কিন্তু পিস্তলের অ্যাডভান্টেজ হল একে, একহাতে ধরে ব্যবহার করা আর অ্যাকিউরেট ফায়ার করা যায়।  পিস্তলের ব্যবহারে একটা ‘ম্যাচো’ ব্যাপার আছে। আর সেটাকে জেমস বন্ড যেভাবে শিল্পের উচ্চাসনে নিয়ে গেছে, আর কেউ সেটা পেরেছে বলে মনে হয় না। 


ইয়ান ফ্লেমিং যখন বন্ডের প্রথম গল্প ক্যাসিনো রয়্যাল লেখেন তখন তার আইডিয়া ছিল না কোন দিকে এই লেখা এগোবে আর কি ইতিহাস তিনি তৈরি করতে যাচ্ছেন। তাই বন্ডকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন বেরেটা ৪১৮ মডেলের সেমি অটম্যাটিক পিস্তল। তাও আবার স্যামি (Chamois leather) লেদারের হোলস্টারে। ফ্লেমিং কোথাও এক্সাক্ট মডেল লেখেননি, স্রেফ উল্লেখ করে গেছেন .25 Beretta বলে। বেরেটা ৪১৮ সেমি অটম্যাটিক পিস্তলের প্রোডাকশন শুরু  হয়েছিল ১৯১৯ সালে। বানিয়েছিল ইতালিয়ান ফ্যাব্রিকা দ্যা আর্মি পিয়েত্রো বেরেটা। এই পিস্তলের ওজন মাত্র ৩১০ গ্রাম, মানে একটা স্যামসাং গ্যালাক্সি ট্যাবের চেয়েও কম। পুরো পিস্তলটা ১৪.৬ সেমি লম্বা যার মধ্যে ব্যারেল ৮.৯ সেমি, একটা ৬ ইঞ্চি স্ক্রীনের মোবাইলের মতো পকেটে চলে যাবে। ম্যাগাজিনে ৮টি গুলি একবারে লোড করা যায়। বারান্দা ব্যাটল বা ক্লোজ ফাইটে তিন থেকে চারটের বেশি গুলি লাগেনা। মানে, চারটে গুলি ফায়ার করতে যে সময় লাগে তার মধ্যে যদি টার্গেট ডাউন না করা যায়, তাহলে নিজের পায়ে হেঁটে ফেরা মুস্কিল।


লেখক ফ্লেমিং নিজে ছিলেন ব্রিটিশ রয়্যাল নেভীর ইন্টেলিজেন্স শাখার কম্যান্ডার (বন্ডের সাথে ভীষণ মিল) তাই তার মনে হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই অস্ত্র একজন ব্রিটিশ সিক্রেট এজেন্টের সাইড আর্ম হিসেবে কাজ চালিয়ে নেবে। বেরেটা বন্ডের ফেভারিট গান। তার পিস্তল গোপনে ক্যারি করার জন্য তার হ্যান্ড গ্রিপ খুলে আরো ছোট করে ফেলা হয়েছিল। পিস্তলে এইম করার পিন থাকে। সেটাকেও ফাইল দিয়ে ঘষে দেওয়া ছিল যাতে পকেট থেকে বের করার সময় কাপড়ে আটকে না যায়। আর ব্যারেলের মাথাটাও ঘষে নেওয়া হয়েছিল যাতে সেই পিস্তলে সাইলেন্সার লাগান যায়। কিন্তু পরে কি ভাবে চেঞ্জ হলো সেই অস্র
Walther PPK:
জেমস বন্ডের চয়েস ছিল বেরেটা, কিন্তু পাঁচটা গল্পের পরে যখন তার পপুলারিটি তুঙ্গে তখন ‘ডক্টর নো’ প্রকাশিত হল। আর সেখানে দেখা গেল তার নতুন অস্ত্র Walther PPK. এই অস্ত্র চেঞ্জের কারন আবার লুকিয়ে ছিল আগের ‘ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ’ গল্পে। এই গল্পে বন্ডের পিস্তল প্যান্টের পকেট থেকে বের করতে গিয়ে সাইলেন্সার কোমরের বেল্টে আটকে যায়। ফলে ভিলেন একটু টাইম পেয়ে গেলে, বন্ড আহত হয়ে বেশ কিছু দিন মেডিক্যাল লিভে কাটান।
১৯৬২ সালে ‘ডক্টর নো’ শুরু হয় বেরেটা M1934 দিয়ে কিন্তু গল্পের মধ্যেই ‘M’ তাকে অস্ত্র চেঞ্জ করতে বলে, আর তার হাতে আসে পিপিকে। সেই পিপিকের খালি প্যাকেট আবার বন্ড গিফট করে মনিপেনিকে! সেই পিস্তল চলে ১৯৯৭ এর গল্প ‘টুমরো নেভার ডাই’ পর্যন্ত। তারপর আবার অস্ত্র চেঞ্জ হয়ে বন্ডের হাতে উঠে আসে ওয়ালদার পিপি নাইন। 
Walther PPK-)(জার্মান অ্যাব্রিভিয়েশনঃ পুলিশ পিস্তল ক্রিমিনাল) বানিয়েছে জার্মান আর্মস ম্যানুফ্যাকচারার ‘কার্ল ওয়ালদার GmbH স্পোর্টওয়াফেন’, এই কোম্পানি প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো অস্ত্র নির্মাতা। ১৯৩১ সালে তৈরি বন্ডের পিপিকে, অরিজিনাল পিপি’র চেয়ে আরোও ছোটো মডেল। এর গ্রিপ আরো ছোটো, ম্যাগাজিন ক্যাপাসিটি কম। সাইজ ছোটো হওয়ার ফলে বন্ডের মত আন্ডারকভার এজেন্টদের পক্ষে সিভিল ড্রেসে লুকিয়ে রাখা সুবিধাজনক। এমনিতেই বন্ডের শ্যাময় লেদারের হোলস্টার অতি বিখ্যাত। ম্যানলি ফ্যাসন আইকন সেই হোলস্টার আর ডায়ালগ,”বন্ড, জেমস বন্ড” সেই সময় আমাদের টিন এজ মাইন্ডে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল। 
কোনও যুদ্ধ হলেই অস্ত্র কোম্পানির পৌষ মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে Walther PPK পিস্তল প্রচুর ব্যবহার হয়। এমন কি হিটলার তার ‘ফুয়েরার বাঙ্কারে’ আত্মহত্যা করেছিলেন এই রকম Walther PPK পিস্তল দিয়েই। 
জেমস বন্ড গল্পে আর পরবর্তিতে সিনেমার দৌলতে বেরেটা আর পিপিকে বিখ্যাত/কুখ্যাত হয়ে ওঠে। ইয়াং ফ্লেমিংকে অস্ত্র চেঞ্জ করার আইডিয়া দেন জিওফ্রে বুথ্রয়েড। আর্মস এক্সপার্ট বুথ্রয়েড ছিলেন এক কেমিক্যাল ইন্ডাসট্রিতে গুলি বানানোর কর্মচারী আর অস্ত্র বিশেষজ্ঞ আর সনামধন্য লেখক। তার লেখা বই বিভিন্ন দেশের মিলিটারি কলেজের টেক্সট বুক! আর বুথ্রয়েড আবার ফ্লেমিং এর গুণমুগ্ধ পাঠক। বন্ডের গল্পে তার সব ভালো লেগেছিল, স্রেফ বেরেটা পিস্তল কে মনে হয়েছিল”লেডিজ গান”। তার সাজেশন অনুযায়ী পাঁচ নম্বর গল্প থেকে ফ্লেমিং বন্ডের অস্ত্র চেঞ্জ করে তার হাতে দেন Walther PPK। যদিও সিনেমাতে তাকে হাতে পিপি মডেল নিতে দেখা গেছে। 
বুথ্রয়েড একজন গুণমুগ্ধ পাঠক হিসেবে লেখক ফ্লেমিংকে  চিঠে লেখেন। চিঠি পেয়ে ফ্লেমিং প্রথমে পাত্তা দেন নি। তার মতে সাইড আর্ম বা অস্ত্রের গুরুত্ব বন্ডের মত ম্যাচো-লেডি কিলার-এজেন্ট কেন্দ্রিক গল্পে খুব কম। কিন্তু পরে বুঝতে পেরে বেশ গুছিয়ে লিখলেন, কেন’ বন্ডের অস্ত্র চেঞ্জ করতে হল। 
বুথ্রয়েড প্রথমে সাজেস্ট করেছিলেন বন্ডের হাতে যেন রিভল্ভার থাকে। কিন্তু ফ্লেমিং চাইছিলেন পিস্তল রাখতে। রিভল্ভারের পেট মোটা চক্র কুইক অ্যাকশনে বের করতে গেলে কাপড়ে ফেঁসে যেতে পারে। তাই বুথ্রয়েড মাঝামাঝি সলিউশন দিলেন ৭.৬৫ মিমি’র Walther PPK, যার শত্রুকে ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা অনেক বেশি, আর এর আছে ডবল অ্যাকশন, মানে হোলস্টার থেকে বের করে ফার্স্ট শট ফায়ার করতে কম টাইম লাগে। ডবল অ্যাকশন মানে একবার ট্রিগার প্রেস করলে পিস্তল কক করা আর ফায়ারিং পিনের হ্যামার রিলিজ করা একসাথে হয়। 
ফ্লেমিং রাজী হলেন, ডঃ নো তে বন্ড পেল পিপিকে আর তার সেই সিনেমার বিজ্ঞাপনের ফলে পিপিকে আবার বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠল। তার লেখা গল্পে এই অস্ত্র বন্ডকে তুলে দিয়েছিলেন ‘মেজর বুথ্রয়েড’ যদিও আসলে বুথ্রয়েডের কোনও মিলিটারি র‍্যাঙ্ক ছিল না। সিনেমাতে আমরা তাকে দেখি ‘Q’ ব্রাঞ্চে। পরে তার নামটা পার্মানেন্টলি  ‘Q’ হয়ে গেছে। 

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

2 × two =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা