28 C
Dhaka
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১

পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংকট ও তাদের এস্টাবলিশমেন্ট

যা পড়তে পারেন

:: এরশাদ নাবিল খান ::

পাকিস্তান আন্দোলনে কোন ভূমিকা না থাকলেও রাষ্ট্র পাকিস্তান অভ্যুদয় হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে বৃটিশদের প্রশিক্ষণে গড়ে ওঠা পাকিস্তান আর্মি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্টে মুসলমানদের জন্য একমাত্র যে স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে তার জন্য সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গুজরাটের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগোষ্ঠী ও আলীগড়ের তালেব-এ -ইলমেরা। রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে সামরিক বাহিনীর ন্যুনতম কোন অবদান ছিলনা। পাঠকদের অনেকের হয়তো জানা নেই পাকিস্তান আর্মির প্রথম দুই সেনাপ্রধান ছিলেন বৃটিশ নাগরিক। 


দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ১৩ মাসের মধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মারা যান। কায়েদে আজমের মৃত্যুর পর দিকনির্দেশনাহীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুযোগে সামরিক জান্তারা কোমর বাঁধতে থাকেন। ১৯৫১ সালে রাওয়ালপিন্ডি কন্সপিরেসির মাধ্যমে পাকিস্তান তাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে হারায়। তাকে হত্যা করা হয় সিআইএর অনুচরের মাধ্যমে। 

জেনারেল জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর নির্বাচন হলে সেখানে “এস্টাবলিশমেন্টের” ধারণার বাইরে গিয়ে বেনজির ভুট্টোর পিপিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যান। পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরে আসলেও সংবিধানে স্বৈরাচার জিয়াউল হকের কালো কানুন মজুদ ছিল। যার সুযোগ নিয়ে ১৯৯০ তে কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বেনজির ভুট্টোর ক্ষমতার চেয়ার উল্টে দেয় সেদেশের প্রেসিডেন্ট। ১৯৯০ এর নির্বাচনে এস্টাবলিশমেন্টের সহায়তায় ক্ষমতায় আসেন তাদের হাতে গড়া নওয়াজ শরীফ। মসনদের লোভে পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে থাকেন। ১৯৮৮-৯৯ পর্যন্ত এই ১১ বছরে চারবার সিভিলিয়ান সরকার পরিবর্তন হয়। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে জেনারেল মোশাররফ সংবিধান স্থগিত করে মার্শাল ল জারি করে নওয়াজ শরীফের সরকারকে বরখাস্ত করেন। মোশাররফের ক্ষমতা দখলকে তখন স্বাগত জানান পিপিপি চেয়ারপারসন বেনজির ভুট্টো জারদারি। বাংলাদেশের এক নেত্রীর মতো তিনিও সেদিন বলেছিলেন “আই এম নট আনহ্যাপি”।


১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী পূর্বপাকিস্তানের ঢাকাতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার দাবিতে আন্দোলনে ৫ জন প্রতিবাদকারী নিহত হন। এরপর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে যে ঘৃণার বীজ রোপিত হয় তা ক্রমান্বয়ে বিদ্রোহে রূপ নেই। ১৯৫৪ সালের ৯ ও ১১ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচন শুধুমাত্র পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয়। ২১ দফা ইশতেহার নিয়ে নির্বাচনে রীতিমতো চমক দেখান শেরে-বাংলার নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট। যে মুসলিম লীগের জন্য বাঙালি হুমড়ি খেয়ে পড়ত, যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রস্তাবক ছিলেন শেরে-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক। সে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর ব্যর্থতায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের জন্য নিমিষেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। নির্বাচনে মুসলিম লীগ মাত্র ৩% এর কম ভোট পায়। ভোটের ব্যবধান কি পরিমাণ ছিল তা অনুমান করা যায় মুসলিম লীগ নেতা প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীন তার নিজের এলাকায় যুক্তফ্রন্টের মামুলি প্রার্থী যুবক খালেকুজ্জামানের কাছে হেরে যায়। .
পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে আইনসভা গঠিত হয় সে আইনসভা বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মেনে নেয় কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে তারা পরবর্তীতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ১৫ মে ১৯৫৪ সালে আদমজী পাটকলে কর্মরত বিহারিদের ওপর হামলা করা হয়। ঐদিনই ৯০ জন বিহারি-বাঙালি নিহত হয়, আহত হয় ১৫০’শ এর উপরে। পরের দিন থেকে সদলবলে বাঙালিরা আদমজী রণক্ষেত্রে পরিণত করে। ১৫-১৯ মে পর্যন্ত ৪০০’ শ জন আদম সন্তান নিহত হয় যার অধিকাংশ ছিল বিহারি। 


পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় শুরু হয় যুক্তফ্রন্টের দুই মাস বয়সী সরকারের বিরুদ্ধে ভয়াবহ প্রপাগাণ্ডা। শেরে-বাংলা পাকিস্তান ভাঙার জন্য শাবল চালাচ্ছেন এই টাইপের বড় বড় কার্টুন প্রকাশিত হতে থাকে। শেরে-বাংলা এই গোলযোগ পরিস্থিতির মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমসে স্বাক্ষাৎকার দেন। সে সাক্ষাৎকারে নিউইয়র্ক টাইমস অনৈতিক ভাবে অসত্য দাবি শেরে-বাংলা করেছেন বলে প্রকাশ করেন। নিউইয়র্ক টাইমস হেডলাইন করে “শেরে-বাংলা পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন করার অঙ্গীকার ব্যাক্ত করেছেন। পরের দিন শেরে-বাংলা নিউইয়র্ক টাইমসের স্বাক্ষাৎকারে তা বলেননি বলে প্রতিবাদ পাঠায়। কিন্তু পাকিস্তানের আইনসভার গোলাম মোহাম্মদ পূর্ব পাকিস্তানের দুই মাস বয়সী প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে গভর্ণর রাজ লাগু করেন। গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন বাঙলা ভাষী মীর জাফরের নাতির ঘরের ছেলে ইস্কান্দার মীর্জাকে। শেরে-বাংলা, তার কৃষি মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রাদেশিক পরিষদের ১৩ জন এমপিকে গ্রেফতার করা হয়। 


১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে ক্ষমতা নেয়া পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাতে এই কার্ফ্যু লাগু হতো এই খতম হতো। জেনারেল আইয়ুব খান স্নায়ুযুদ্ধ কালের এই কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যালেন্স করে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে সচেষ্ট ছিলেন। ইস্কান্দার মীর্জার বন্ধু শাহনেওয়াজ ভুট্টো যিনি বৃটিশ ভারতের জুনাগড়ের নায়েব ছিলেন তার ছেলে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৬১ তে তার শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী নিয়োগ করেন। বছর খানেকের মধ্যে জেনারেল আইয়ুব খান ভুট্টোকে পদোন্নতি দিয়ে তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করেন। মূলতঃ ৫ বছর ধরে জেনারেল আইয়ুব খানের গর্ভে জন্ম নেয় জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি। ১৯৬৬ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো পিপিপি প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের পালাক্রমে ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে আইয়ুব খানের পতন হলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন আগা ইয়াহিয়া খান। ১৯৭০ এর প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় দ্বীপ জেলা ভোলাসহ পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি ও পাঁচ লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটায়। মধ্যপ ইয়াহিয়া খানের প্রশাসন ত্রান-সাহায্য নিয়ে তেমন পাশে এসে দাঁড়াতে পারেনি। 


১৯৭০ এর ডিসেম্বরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ভূমিধস জয়লাভ করে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টোর পিপিপি অধিকাংশ আসন (৮১) জিতলেও তা মুত্তাহিদা পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসার জন্য পর্যাপ্ত ছিলনা। ক্ষমতার লোভে শিয়া ধর্মালম্বী জুলফি ভুট্টো তার বন্ধু ইয়াহিয়ার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে চাচ্ছেন না। ১৯৭১ এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বর্বরোচিত গণহত্যা চালান ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের অনুগত পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী। নিজেদের ইগোর জন্য পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ভূখণ্ড হারিয়ে ফেলে সাথে হারায় সাড়ে ৭ কোটি জনগণ। 


নিজেদের ভূখণ্ডের একটি অংশ হারিয়ে ফেলার পরও এই মাথামোটা বাহিনী নিজেদেরকে পাকিস্তানের হিরো হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকে। ক্ষমতার কুক্ষিগত রাখার জন্য জুলফিকার ভুট্টোও সেদেশের জনগণের কাছে মজলুমিয়াত বিক্রি করতে থাকে। যে ক্ষমতার জন্য জুলফি ভুট্টো পাকিস্তান ভাঙায় শরীক ছিলেন সে ক্ষমতা আস্তে আস্তে ঢলে পড়তে থাকে। ১৯৭৭ সালে এক বিতর্কিত নির্বাচনে জুলফিকার ভুট্টো পুনরায় ক্ষমতায় আরোহন করে। কিন্তু সারাদেশে নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষ বাঁধা দেয়। ভুট্টোর অনুগত সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউল হকের ইশারায় ৯ দলের ঐক্যজোট ইসলামাবাদে মার্চ করে যার নেতৃত্ব দেয় মুফতী মাহমুদ মাদানী যিনি মওলানা ফজলুর রহমানের পিতা। পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি বামপন্থী ফায়েজ আহমেদও মোল্লাদের মার্চে বক্তব্য দেন। এই সুযোগে জেনারেল জিয়াউল হক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ভুট্টোকে গ্রেফতার করেন। সারাদেশে মার্শাল ল জারি করেন, ৩ মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন দেয়ার অঙ্গীকার করেন। ভুট্টোকে তার অনুগত কাসুরীকে হত্যার দায়ে ১৯৭৯ তে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যদণ্ড প্রদান করেন। ঠিক ঐবছরই সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান আক্রমণ করে দখল করে নেন। পাকিস্তান আর্মি বেলুচিস্তান দখল হয়ে যাবে এ ভয়ে আমেরিকার সাথে হাত মেলান।


জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতায় আসার পর থেকে শুরু হয় অদ্ভুত ইসলামাইজেশন। ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে পাঞ্জাব ও সিন্ধুপ্রদেশের প্রভাবশালী ফিউডাল লর্ডদের রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে নিজের অনুগতে নিয়ে আসেন দুই প্রধান ইসলামি দল-“জমিয়তে উলেমা ও জামায়াতে ইসলামী কে”। কাশ্মীরি বংশদ্ভূত লাহোরের প্রভাবশালী মিয়া শরীফের বড় ছেলে মিয়া মোহাম্মদ নওয়াজ শরীফকে পাঞ্জাব প্রদেশের অর্থমন্ত্রী বানিয়ে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। সিন্ধুর মফস্বলে সৃষ্টি করেন পীর-পাগারাদের নিয়ে মুসলিম লীগ (এফ) আর করাচিতে তৈরি করেন গোত্রভিত্তিক উর্দু সম্প্রদায়ের মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম)। ১৯৮৫ সালে পিপলস পার্টিকে ঠেকাতে নন পার্টি ইলেকশন করান দেশের সব প্রদেশের প্রভাবশালী জমিদার, ফিউডাল লর্ড, পীর ও ইসলামি রাজনীতি করার খায়েশে আসক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে। 


পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন মিয়া মোহাম্মদ নওয়াজ শরীফকে। তাকে দিয়েই প্রতিষ্ঠা করান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) যেখানে শামিল হন দেশের সব প্রভাবশালী জমিদার ও পুঁজিপতিরা। স্বৈরাচার জিয়াউল হকের সেমি শরীয়া শাসনে পুরো পাকিস্তানের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পোলারাইজেশন বাড়তে থাকে। কালাশনিকভ কালচার ও হেরোইন কালচার বিস্তৃতি হয় জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে। ১৯৮৬ তে ভুট্টো কন্যা বেনজির ভুট্টো ইংল্যান্ড থেকে পাকিস্তানে ফিরলে স্বৈরাচার জিয়াউল হকের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে। জেনারেল জিয়াউল হকের অনুগত কোর কমান্ডাররাও আস্তে আস্তে সঙ্গ ত্যাগ করতে থাকেন। এরই মাঝে ১৯৮৮ সালের ১৭ আগষ্ট জেনারেল জিয়াউল হক তার জন্মস্থান ভাওয়ালপুরে যাওয়ার সময় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। জেনারেল জিয়াউল হকের সফরসঙ্গী হয়ে সে বিমানের যাত্রী ছিলেন তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। 


জেনারেল জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর নির্বাচন হলে সেখানে “এস্টাবলিশমেন্টের” ধারণার বাইরে গিয়ে বেনজির ভুট্টোর পিপিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যান। পাকিস্তানে গণতন্ত্র ফিরে আসলেও সংবিধানে স্বৈরাচার জিয়াউল হকের কালো কানুন মজুদ ছিল। যার সুযোগ নিয়ে ১৯৯০ তে কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বেনজির ভুট্টোর ক্ষমতার চেয়ার উল্টে দেয় সেদেশের প্রেসিডেন্ট। ১৯৯০ এর নির্বাচনে এস্টাবলিশমেন্টের সহায়তায় ক্ষমতায় আসেন তাদের হাতে গড়া নওয়াজ শরীফ। মসনদের লোভে পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে থাকেন। ১৯৮৮-৯৯ পর্যন্ত এই ১১ বছরে চারবার সিভিলিয়ান সরকার পরিবর্তন হয়। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে জেনারেল মোশাররফ সংবিধান স্থগিত করে মার্শাল ল জারি করে নওয়াজ শরীফের সরকারকে বরখাস্ত করেন। মোশাররফের ক্ষমতা দখলকে তখন স্বাগত জানান পিপিপি চেয়ারপারসন বেনজির ভুট্টো জারদারি। বাংলাদেশের এক নেত্রীর মতো তিনিও সেদিন বলেছিলেন “আই এম নট আনহ্যাপি”।


মূলত ১৯৮৮-৯৯ পর্যন্ত যে গণতন্ত্র চলছিল তার নাটাই ছিল পাকিস্তানের ক্ষমতাধর এস্টাবলিশমেন্টের হাতে। ক্ষমতার লোভে রাজনৈতিক দলগুলো জেনারেল হেড কোয়ার্টার (জিএইচকিউ) তে নিয়মিত ধর্না দিতে থাকেন। সিভিল ব্যুরোক্র্যাট ও মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাট দ্বারা শাসনের ফলে দেশটিতে টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে উন্নয়ন দুমড়ে মুচড়ে পড়েছে। মিলিটারি ডিক্টেটর ও রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে কিংবা টিকিয়ে রাখতে ইসলামি দলগুলোকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষমতার স্বাদ পাইয়ে দেন। পাকিস্তানের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল যারা বিগত ৫০ বছর ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় পালাবদল করে থেকেছেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য উভয় দলেরই জন্ম হয়েছে জেনারেল হেড কোয়ার্টারের (GHQ) গেইট নম্বর-৪ থেকে। জুলফিকার আলি ভুট্টোর রাজনৈতিক জন্ম হয়েছে জেনারেল আইয়ুব খানের গর্ভ থেকে আর মিয়া মোহাম্মদ নওয়াজ শরীফের রাজনৈতিক জন্ম জেনারেল জিয়াউল হকের গর্ভ থেকে। 
জেনারেলদের রাজনীতিবিদ, রাজনীতিকে কন্ট্রোলের অতিরিক্ত খায়েশের ফলে সিভিল প্রশাসন ও সামাজিক খাতে পাকিস্তান অগ্রসর হতে পারেনি। প্রশাসন, বিচারবিভাগ ও মিডিয়ায় এস্টাবলিশমেন্টের অনুগত ব্যক্তি যেমন বৃহদাকারে আছে তেমনিভাবে ব্যবসায়ী ও সুশীল সমাজেও প্রো-এস্টাবলিশমেন্ট অনুগত ব্যাক্তির ছড়াছড়ি। জাতিগত বৈষম্যে, গোত্রগত সংঘাত ও উগ্র ডানপন্থীদের কলহে দেশটি বিগত ৭৩ বছরে আগাতেই পারেনি। বিশ্বের নামকরা সব সংস্থার যেকোন বৈশ্বিক সামাজিক সূচকে পাকিস্তানের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নে দেখা যায়। সামরিক সক্ষমতাকে বাড়াতে ও রক্ষা করতে গিয়ে দেশটির উন্নয়নের অর্ধেক আয় সামরিক খাতে পর্যায়ক্রমে ব্যয় করা হয়েছে। এমনকি অদূর ভবিষ্যতে এই ব্যয় বাড়তেই থাকবে। 


পাকিস্তানের বাৎসরিক আয়ের উৎস হতে অর্ধেক চলে যাচ্ছে রাষ্ট্রের দেনা পরিশোধে। যার মধ্যে আছে বিপুল পরিমাণের বৈদেশিক ঋণ। বড় আকারের একটা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে আরেকটি বিদেশি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আট বার কমিটমেন্ট রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারত ব্যর্থ হয়েছে দুইবার কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য হেনরি কিসিঞ্জারের “তলাবিহীন ঝুড়ি” বাংলাদেশ একবারও কমিটমেন্ট রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়নি। পাকিস্তানের বর্তমান জিডিপির ৮৯% হচ্ছে রাষ্ট্রীয় দেনা যার ৪৬% হচ্ছে বৈদেশিক ঋণ। ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য তাদের বাৎসরিক বাজেটের অর্ধেক অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। যার ফলে যেসব অর্থ সামাজিক খাত ও জনগণের মৌলিক চাহিদায় যোগান দেয়া যেত তা চলে যাচ্ছে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের পকেটে। 
রাষ্ট্রের এই বৃহৎ ছিদ্রগুলো যাতে ঢেকে রাখা যায় এবং বেশিরভাগ আওয়ামকে অন্ধকারে রাখা যায় তারজন্য পিছেপর্দা প্রিপ্ল্যানড আঞ্চলিক ও গোত্রগত সংঘাত জারি রাখা হয়েছে। বুনিয়াদি তালিম ও মৌলিক অধিকার থেকে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫১ ভাগ নারী হলেও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি অঙ্গনে তাদের অংশগ্রহণ মাত্র ২১ শতাংশ। নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তান এখনও অনেক পিছনে পড়ে রয়েছে। একটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্ধেক জনসংখ্যাকে অন্ধকারে রেখে কখনোই সম্ভব না। কয়েক যুগের জালিম শাসকদের কারণে রাষ্ট্র পাকিস্তানের সংকট অনেক গভীরে প্রোথিত হয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নয়া প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকারকে দিনরাত কাজ করতে হবে। তবে বিগত সামরিক ও সিভিলিয়ান সরকারগুলোর রেখে যাওয়া আবর্জনার স্তুপ ইমরান খানের প্রথম সরকার সরাতে পারবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। তারজন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় জাগরণ, নীতিমালা প্রণয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন।

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

five × four =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা