29 C
Dhaka
রবিবার, আগস্ট ১, ২০২১

প্রেসসচিবের ‘মাতারি’ ও ত্যাঁদড় বুদ্ধিজীবীরা

যা পড়তে পারেন

:: মারুফ কামাল খান ::

আমরা জাতীয় প্রেসক্লাবের বাইরের লাউঞ্জে বসে চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম সন্ধ্যার পর। হঠাৎ করেই এসে হাজির হলেন হুমায়ুন আজাদ। বসেই বললেন: “সাংবাদিকদের কাছে জানতে এলাম আমার কোনো একটা বই নাকি নিষিদ্ধ করা হয়েছে?” আমি মোজাম্মেল ভাইকে দেখিয়ে দিলাম। বললাম: “উনি বলতে পারবেন। উনি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রেসসচিব মোজাম্মেল হক।” মোজাম্মেল ভাই আমার দিকে রাগ হয়ে তাকালেন। “আমি কি এসব খবর নিয়ে ঘুরি? ভাইরে, আমারে ধরাইয়া দিলেন? দিলেন তো আড্ডাটা মাটি করে। বই নিষিদ্ধ হলে তো সরকার নিজেই তথ্যবিবরণী দিয়ে জানাবে। রেডিও-টিভিতে খবর দিবে। এরজন্য প্রেসক্লাবে এসে খোঁজ নেয়ার দরকার আছে?”বিরক্ত হলেও তিনি সেলফোনে দু’তিন জায়গায় ফোন করে খবর নিলেন। তারপর বললেন, “না, আপনার কোনো বই টই নিষিদ্ধ হয়নি। তবে তসলিমা নাসরিন নামে এক মাতারি আছে না? সে কী একটা লিখেছে ‘লজ্জা’ নামে। যার নিজেরই কোনো লজ্জা নাই, সে আবার লিখেছে লজ্জা। ঐটা নিষিদ্ধ করেছে। একটু পর খবর হবে।” হুমায়ুন আজাদ “ও আচ্ছা, ধন্যবাদ” বলে উঠে পড়লেন। মোজাম্মেল ভাইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, “আপনার ওই ‘মাতারি’ শব্দের ব্যবহারটা ভালো লাগলো না।” মোজাম্মেল ভাই বললেন, “কেন? অভিধান খুলে দেখেন, মাতারি শব্দের কোনো মন্দ অর্থ আছে কিনা।” হুমায়ুন আজাদ বললেন, “আমি এদেশের একমাত্র ভাষাবিজ্ঞানী। আপনি আমাকে শব্দের অর্থ অভিধান খুলে দেখতে বলছেন? আপনাকে জানতে হবে আভিধানিক অর্থের বাইরে শব্দের প্রায়োগিক অর্থও থাকে। মাতারি শব্দের প্রায়োগিক অর্থ ইতিবাচক নয়। এটা তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আপনিও তুচ্ছার্থেই ব্যবহার করেছেন। এখন তর্কের খাতিরে আভিধানিক অর্থের কথা বলছেন।”মোজাম্মেল ভাই হাঃ হাঃ করে হাসলেন। বললেন, “আপনি কি মনোবিজ্ঞানীও? আমি একটা শব্দ তুচ্ছার্থে নাকি উচ্চার্থে ব্যবহার করেছি, সেটাও আপনি জেনে ফেলেছেন? আর বলেন দেখি ভাষাবিজ্ঞানী জিনিসটা কী? সেন রাজাদের মতে, বাংলা হৈলো গিয়া পক্ষীকূলের একটা ভাষা। সেইটার আবার বিজ্ঞানী আপনি? আপনারে এই বিজ্ঞানী খেতাব কে দিছে? ভাষামিস্ত্রী বললেও মানতে পারতাম।” ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে নিজেকে উন্নাসিক হিসেবে জাহির করতে সিদ্ধহস্ত অধ্যাপক কিন্তু ততোক্ষণে বুঝে ফেলেছেন যে, আজ তারই মতন আরেক উন্নাসিকের পাল্লায় পড়েছেন। তাই তিনি আর তর্ক না বাড়িয়ে “যে যেমন বুঝে” বলে পা বাড়াতেই মাহমুদ শফিককে দেখে থামলেন। আসলে হুমায়ুন আজাদের মনে হয় সেদিন ‘জোড়া কপাল খারাপ’ ছিল।মাহমুদ শফিক বিশিষ্ট কবি এবং সাংবাদিক সমাজে আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়েছেন তিনি। সেই সুবাদে হুমায়ুন আজাদ হয়তো তাকে ছাত্রই জ্ঞান করতেন। মাহমুদ শফিক অবশ্য হুমায়ুন আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার আগেই পাস করে বেরিয়ে যান। তার আগে হুমায়ুন আজাদের নাম ছিল হুমায়ুন কবির। এফিডেবিট করে নাম বদলে তিনি হুমায়ুন আজাদ করেছিলেন। “স্যার, চা খান।” সালাম দিয়ে বললেন মাহমুদ শফিক। “না, চা আমি খেয়েছি। তা আপনি কেমন আছেন শফিক? অনেক দিন পরে দেখা। জানতাম আপনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি টুকটাক কবিতা টবিতাও লেখেন। ইদানীং শুনতে পাচ্ছি আপনি নাকি গান-টানও লিখছেন?” মাহমুদ শফিক বললেন, “জ্বী স্যার। আমি শতাধিক হিট গানের গীতিকার। দেশের সেরা শিল্পীরা আমার গান করেন। শ্রেষ্ঠ সব সুরকারেরা সুর দিয়েছেন আমার লেখা গানে। রেডিও-টিভিতে কুড়ি বছর ধরে আমি ‘এ’-গ্রেড গীতিকার হিসেবে এনলিস্টেড।” হুমায়ুন আজাদ তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ব্যঙ্গাত্মক হাসলেন। বিদ্রুপ ভরা কণ্ঠে বললেন, “কিন্তু এ দু’টোকে মেলান কী করে? কবিতা রচনা ও গান লেখা! কবিতা একটা অতি নান্দনিক, সুকুমার শিল্পের চর্চা। আর গান টান লেখা মানে তো আমার কাছে ইট ভাঙ্গার মতন একটা ব্যাপার।” মাহমুদ শফিক এবার সত্যিই চটলেন। বললেন, “আপনি যে এতোটাই মূর্খ তা তো আগে বুঝিনি। বাংলাভাষায় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মতন কবিরা সবাই কালজয়ী গীতিকারও। গানের লিরিকও যে সেরা গীতিকবিতা হতে পারে সেটাও আপনি জানেন না?” হুমায়ুন আজাদ বললেন, “গীতিকবিতা ও লিরিক এ বিষয়গুলো তো আমি পড়াই। আপনি আমাকেই ওগুলো শেখাচ্ছেন? আর রবি ঠাকুর বা নজরুল গান লিখলেই সেগুলো খুব ভালো কিছু হয়েছে বলে মানতে হবে? ওগুলোর কথা-টথা ও বাণী আসলে কিচ্ছু হয়নি। বেশির ভাগই অতিশয় নীচুমানের। কেবল সুর-সংযোগের কারণে উৎরে গিয়েছে।”মাহমুদ শফিক আরো কড়া করে কিছু একটা জবাব দিতে যাচ্ছিলেন। আমরা কয়েক জন হুমায়ুন আজাদকে আর দাঁড়াতে না দিয়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বিদায় জানালাম। আমি বেরিয়ে পড়লাম তসলিমার ‘লজ্জা’ বইয়ের একটা কপি জোগাড় করতে। ওটির নাম শুনেছিলাম কিন্তু তখনো পড়া হয়নি। নিষিদ্ধ হবার কথা চাউর হলে বইটি আর হয়তো পাওয়াই যাবেনা। তোপখানা সড়কের পাব্লিক টেলিফোন বুথের কয়েন বাক্স থেকে পরিচিত বুক সেলারকে ফোন করলাম। তিনি আমাকে প্রেসক্লাবেই থাকতে বললেন। একটু পর দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরবেন। ফিরতি পথে ক্লাবে থেমে আমাকে ‘লজ্জা’ দিয়ে যাবেন। তিনি যথারীতি এসে দিয়েও গেলেন। রাতে বাসায় ফিরে খেয়েদেয়ে খুব আয়েশ করে বসে তসলিমার আলোচিত উপন্যাসটির পাতা মেললাম। খুব হতাশ হলাম। একদমই টানে না। মনে হলো, এটা কিচ্ছু হয়নি। জোর করে লেখা একটা ফরমায়েশি কেচ্ছা মাত্র। নিষিদ্ধ না করলে এটা হয়তো তেমন কোনো আলাপেই আসতো না বলেই আমার ধারণা জন্মালো।তসলিমার ‘লজ্জা’ নিষিদ্ধ হবার সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগেই ড. হুমায়ুন আজাদকে ‘তাঁরও একটা বই নিষিদ্ধ হচ্ছে’ বলে ভুয়া খবর কে দিয়েছিলেন এবং তার উদ্দেশ্য কী ছিল তা আর কখনো আমার জানা হয়নি। তবে হুমায়ুন আজাদের আচরণ, চরিত্র, বাচনভঙ্গী ও উন্নাসিকতার ব্যাপারে আমার ভালোই জানা ছিল। তাঁর মতামত ও প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও হুমায়ুন আজাদের পাণ্ডিত্য ও স্পষ্টবাদিতা আমার বেশ পছন্দই হতো। বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনে শিল্প-সাহিত্য-প্রকাশনা বিষয়ক একটা পাক্ষিক অনুষ্ঠান অল্পদিন চালিয়েছিলাম। তবে ঈর্ষাকাতর জাতীয়তাবাদীদের নানান রকম খোঁচাখুঁচি ও না-হক সমালোচনায় বিরক্ত হয়ে নিজে থেকেই সেটি ছেড়ে দিই। পরে অগ্রজ কবি-সাংবাদিক সাযযাদ কাদির সেটা চালাতেন এবং দীর্ঘদিন কন্টিনিউ করেছেন। যা হোক, সেই অনুষ্ঠানের একটা এপিসোডে আমি হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ ও হেলাল হাফিজকে একত্রে এনেছিলাম। সেখানে ড. হুমায়ুন আজাদ একেবারেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দিলেন হুমায়ূন আহমেদের লেখাজোখা। বললেন, যত জনপ্রিয়ই হোক, সাহিত্যমান ও শিল্পের বিচারে হুমায়ূন আহমেদের লেখা গল্প-উপন্যাস উত্তীর্ণ নয়। সময়ের ধোপে এগুলো টিকবে না। হুমায়ূন আহমেদ অবশ্য খুব ধীর শান্তভাবে তার অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “আমি পাঠকের জন্য লিখি। পাঠক তৃপ্ত হলেই আমিও খুশি। আমার লেখা আগামীতে টিকবে কিনা জানিনা। তবে কম বয়সে লঞ্চে চড়ে যখন মামাবাড়ি যেতাম, সে সময় ‘ইন্ডিয়ান লেখকের বই’ বলে হকারদের হেঁকে হেঁকে গল্প-উপন্যাস বেচতে দেখতাম। এখন ইন্ডিয়ান লেখকদের নাম করে আর শোনা যায়না তাদের সেই হাঁকডাক। এই যে পরিবর্তন, তাতে কিছুটা হলেও আমার অবদান আছে।”‘নব্বুইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের ইলেকশনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। সে সময় সাপ্তাহিক বিচিত্রায় সম্ভবতঃ মাহমুদ শফিকের নেয়া এক সাক্ষাতকারে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, “আমি ভোট দিতে যাইনি। ভোট দিলে অবশ্যই ধানের শীষে ভোট দিতাম।” হুমায়ূন আহমেদকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তাঁর চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ তৈরির জন্য বেগম জিয়ার সরকারই অনুদান দেয় এবং অন্যান্য সহায়তা করে। সেই কালে হুমায়ুন আজাদের মতন ‘ত্যাঁদড় বুদ্ধিজীবী’ও দেশের প্রধান দুই নেত্রীর মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার পরিমিতিবোধ ও মাত্রাজ্ঞানের প্রশংসা করে বলেছিলেন, “বেগম জিয়া যে অনেক কিছুই জানেন-না, সেটা অন্ততঃ তিনি জানেন এবং সে কারণেই কথা কম বলেন। তবে শেখ হাসিনা যে অনেক কিছুই জানেন না, তিনি সেটাও জানেন না এবং সে কারণেই তিনি অতিরিক্ত কথা বলেন।” পরে বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক মহলে বিএনপি ও বেগম জিয়ার প্রতি সেই অনুকূল মনোভাব ক্রমে পরিবর্তিত হয়। আমার নিজের ধারণা, অনেক কারণের মধ্যে এর একটা কারণ হয়তো, বুদ্ধিবৃত্তি ও প্রচারমাধ্যমের প্রতি এই দলের একধরণের তাচ্ছিল্য ও উন্নাসিকতা।সেই আমলে ড. হুমায়ুন আজাদের আরেকটি রসাত্মক বয়ানের কথা বলি। তখন বাংলা একাডেমী চত্বরে একুশের গ্রন্থমেলার একপ্রান্তে চায়ের স্টল ও খাবারের দোকান বসতো। এক বিকেলে একটা স্টলে আমি ও কবি-সাংবাদিক মাশুক চৌধুরী বসা। হুমায়ুন আজাদ এসে বললেন, “আমি খুঁজছিলাম সকাল থেকেই। এখন একসঙ্গে পেলাম এক জোড়া সাংবাদিককে। আচ্ছা, বলুন তো এদেশে ডাক্তারেরা কি এতো নপুংসক হয়ে গিয়েছে যে, এখন ধর্ষণের কাজটাও তাদেরকে হাত দিয়ে সারতে হচ্ছে?” আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে এ প্রশ্নের মাজেজা বুঝতে চাইলাম। তিনি বললেন, “আজ সকালেই ‘বাংলারবাণী’ পত্রিকায় দেখলাম তারা একটা খবরের হেডলাইন করেছে: ‘ডাক্তারের হাতে রোগিনী ধর্ষিতা।’ ব্যাপারটা কি একটু বুঝিয়ে বলবেন, হাতে ধর্ষিতা মানে কী?”আমাদের মোজাম্মেল ভাইয়ের চরিত্রেরও কিছুটা মিল ছিল হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে। খুব মেধাবী ও পরিশ্রমী সাংবাদিক ছিলেন। দৈনিক বাংলা তখন সাংবাদিকতার গুণগত মানে দেশসেরা বাংলা সংবাদপত্র বলে বিবেচিত অনেকের কাছেই। ফিলিপস পুরস্কার চালু হলে মোজাম্মেল হক সে পত্রিকায় রিপোর্টিংয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ রিপোর্টার হিসেবে ওই পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেটাই ছিল প্রথম ফিলিপস পুরস্কার, এরপর অন্যরা পেয়েছেন। সাংবাদিকদের কাছে তাঁর গ্রহনযোগ্যতাও যথেষ্ট ছিল। পরপর দু’বার তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন। দুই ফোরামে ভাগ হয়ে তখন সাংবাদিকদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন হতো। আগে জাতীয় প্রেসক্লাবে একটা অলিখিত নিয়মে প্রেসিডেন্ট পদটি এডিটরদের জন্য সংরক্ষিত থাকতো। আর সব পদে ভোট হলেও এডিটরেরা বসে ঠিক করতেন তাঁদের মধ্য থেকে এবার ক্লাবের প্রেসিডেন্ট কে হবেন। একজনকে নির্ধারণ করার পর আর কেউ প্রার্থী হতেন না এবং বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি নির্বাচিত বলে ঘোষিত হতেন।এ ঐতিহ্য ও অলিখিত নিয়ম ভেঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাব প্রেসিডেন্ট পদে প্রথম প্রার্থী হন গিয়াস কামাল চৌধুরী। গিয়াস ভাই তখন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট এবং ভয়েস অব অ্যামেরিকা’র বাংলা বিভাগের সংবাদদাতা। সাংবাদিক কম্যুনিটিতে তো বটেই, সাধারণ লোকের মধ্যেও জনপ্রিয়তা তুঙ্গে তাঁর৷ জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট পদ নিশ্চিত করতে তিনি এক কাণ্ড ঘটালেন। তাঁর ধারণা ছিল, তিনি যেখানেই থাকেন, এন্টি আওয়ামী ভোটের একটা বড় অংশ তো তিনি পাবেনই। প্রো-আওয়ামী ভোট নিশ্চিত করতে পারলে তাঁকে আর ঠেকায় কে? এই বিবেচনা থেকে তিনি প্রো-আওয়ামী ফোরাম থেকে প্রার্থী হন। ফোরাম বদলের এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া শুভ হয়নি। গিয়াস ভাইয়ের মতন জাঁদরেল প্রার্থী হেরে যান এন্টি-আওয়ামী ফোরামের তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রার্থী ফাজলে রশীদের কাছে। পরে অবশ্য গিয়াস ভাই দ্রুত নিজের শিবিরে ফেরেন এবং পরের টার্মে প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হন। গিয়াস কামাল চৌধুরীর পর মোজাম্মেল হক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে চাইলে আমাদের ফোরামের সিনিয়ররা অনেকে আপত্তি তোলেন। এডিটর কাউকে প্রার্থী করতে চান। তরুণেরা মোজাম্মেল হকের পক্ষ নেন। তারা বলেন, এডিটর না হয়ে গিয়াস ভাই ও রশিদ ভাই প্রেসিডেন্ট হতে পারলে মোজাম্মেল ভাই কেন পারবেন না।? অনেক বিতর্কের পর শেষ অব্দি নমিনেশন পান মোজাম্মেল ভাই এবং বড় ভোটের ব্যবধানেই জেতেন।মোজাম্মেল হকের তুখোড় সেন্স অব হিউমার ছিল। এইচএম এরশাদ যেদিন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করেন সেদিন সন্ধ্যার ঘটনা। নির্মল সেন তখন দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক। তিনি বিকেলে দৈনিক বাংলা অফিস থেকে বেরিয়ে তাঁদের পার্টি অফিসে যেতেন। সন্ধ্যার পর আবার ঢুকতেন দৈনিক বাংলায়। নিজের লেখার ফাইন্যাল প্রুফ দেখতেন। দিনের উল্লেখযোগ্য খবরাখবর জেনে নিতেন। তারপর প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে গিয়ে রাতের খাবার সেরে বাসায় যেতেন অকৃতদার এই প্রবীণ সাংবাদিক। সেদিন নির্মল দা সন্ধ্যার পর দৈনিক বাংলার নিউজরুমে ঢুকে সামনে পেলেন মোজাম্মেল হককে। “কী হে মোজাম্মেল, বলো আজকের খবরাখবর কী?” মোজাম্মেল ভাই বললেন, “দাদা এসেছেন? খবর আছে আপনার।” নির্মল দা ভাবলেন সত্যি বুঝি। “কী খবর আছে আমার বলো।”- আপনি এখনো জানেন না?- না তো।- এরশাদ আপনাকে একটা ‘হো’ দিয়েছে।- তার মানে?- মানে হলো, আপনার নাম নির্মল সেন। ওই নাম আর চলবে না। এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছে আজ। এখন থেকে আপনার নাম হবে নির্মল হোসেন। সেন-এর আগে একটা ‘হো’ যোগ করতে হবে।নির্মল দা হো হো করে হাসলেন। “তুমি পারোও বটে! দারুণ উদ্ভাবনী মস্তিস্ক তোমার।”ছড়াকার আবু সালেহ্ দারুণ এক প্রতিবাদী চরিত্র। তাঁর দল বিএনপি ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এলেও তিনি দল-সরকারের নানান অসঙ্গতি-অনিয়মের বিরুদ্ধেও নিরলস ছড়া লিখে যাচ্ছেন। বিএনপির আদর্শবিরোধী অনেককে তখন দল ও সরকারে ঢুকে নানান সুবিধা নিতে দেখে সালেহ্ ভাই লিখলেন: “চাকরি সূত্রে জাতীয়তাবাদী/ সুবিধা সূত্রে দলীয়/ গোপনে জ্বালায় মঙ্গলদীপ/ সুগন্ধায় গিয়ে বলিও।” সুগন্ধা তখন ছিল প্রধানমমন্ত্রীর সান্ধ্যকালীন রাজনৈতিক দপ্তর। দলের মহাসচিব তখন আব্দুস সালাম তালুকদার। আর ভূমি, শিক্ষা, আইনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ে দায়িত্ব পালনের কারণে মন্ত্রী জমিরউদ্দিন সরকারও বেশ আলোচিত। সালেহ্ ভাই তাঁর এক ছড়ায় লিখলেন: “তালুকদারের তালুক যাবে, জমিরউদ্দিনের সরকার।” সেটা পড়ে সালাম ভাই নাকি হেসে বলেছিলেন, “ঠিকই তো লিখেছেন সালেহ্ সাহেব। কোনো কিছুই তো আর চিরস্থায়ী নয়। জমিদারী, তালুকদারী, সরকার, ক্ষমতা তো একদিন না একদিন যাবেই।” কিন্তু সকলেই তো আর সালাম ভাইয়ের মতন সহনশীল নন। প্রেসক্লাবে একদিন সালেহ্ ভাই বললেন, “নতুন একটা ছড়া লিখেছি। শুনবেন?” আড্ডায় ছেদ পড়ায় বিরক্ত হয়ে মোজাম্মেল ভাই বললেন, “রাখেন আপনার ছড়া। ছড়া টড়া লিখে কী হয়?” সালেহ্ ভাই বললেন: “লিখে কিছু হয় না? তাহলে আপনার নামেই লিখে দিই একটা ছড়া।”দু’দিন পর ‘বাংলাবাজার’ পত্রিকায় ঠিকই বেরিয়ে গেলো মোজাম্মেল ভাইয়ের নামে সালেহ্ ভাইয়ের লেখা এক ছড়া: “ভানুমতির খেল দেখালে/ ভানুমতির খেল/ প্রধানমন্ত্রীর তথ্যসচিব/ মাতাল মোজাম্মেল।” উনার পানাভ্যাসের ব্যাপারে ইঙ্গীতবহ ছড়াটি তাঁর ইমেজের জন্য বেশ ক্ষতিকারক ছিল। সেদিনই সন্ধ্যায় মোজাম্মেল ভাই ক্লাবের লাউঞ্জে আমাদের সাথে গল্প করছেন। এমন সময় ঢুকলেন সালেহ্ ভাই। আমরা বেশ বিব্রত। কিন্তু মোজাম্মেল ভাই ডাকলেন: “এই যে সালেহ্ সাহেব, আসেন, বসেন। পড়েছি আপনার ছড়া। ছড়া তো বেশ ভালোই লেখেন। তবে আমিও যে এককালে ছড়াকার ছিলাম সেটা জানেন তো?”- জানবো না কেন? আপনি তো ‘কিশোর বাংলা’ পত্রিকারও স্টাফ ছিলেন। ওই পত্রিকাতেও আপনার ছড়া পড়েছি।- ভোলেন নি তাহলে? শোনেন, আপনার লেখা ছড়া পড়ে আমার মাথায়ও একটা ছড়া এসেছে। শুনবেন?- বলেন।- ওরে আবু সালেহ্/ বিএনপি হলি হালে/ ছিলি কোন্ ডালে/ তোরে পুছে কার বালে?সবাই হাসতে লাগলো। সালেহ্ ভাই বললেন, “কিন্তু অশ্লীল হয়ে গেলো না?”- মাতাল অশ্লীল না-হলে বালও অশ্লীল নয়। ছাপাইয়া দেই এইটা এখন?- না, সেটা আপনি পারেন না। প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব আপনি। এটা আপনার পদমর্যাদার সঙ্গে যায় না। আর এতে ম্যাডামের ইমেজও ক্ষুন্ন হবে।- তাহলে আপনি আমার ইমেজ ক্ষুন্ন করে লিখলেন কেন? এতে প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ ক্ষুন্ন হয়নি?- আপনি আমাকে পাত্তা দেননি। ছড়া পড়তে বাধা দিয়েছেন এবং ছড়া লিখে কিছু হয়না বলেছেন। তাই রাগ করে লিখেছি।- আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি অপমান করেছিলাম। আপনিও প্রতিশোধ নিয়েছেন। শোধ হয়ে গিয়েছে। আর আমরা কেউ কারুর বিরুদ্ধে লিখবো না।আজ যাদের কথা লিখলাম তাদের মধ্যে অনেকেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। মেধাচর্চিত ঐসব প্রতিযোগিতা এবং মধুর প্রতিশোধের আড়ালে লুকানো তাদের মহত্ত্বকথাগুলো এখন খুবই মিস করি।

লেখকঃ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব 

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

seven − four =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা