28 C
Dhaka
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১

বিভক্তির ঘেরাটোপে বাংলাদেশের গণমাধ্যম

যা পড়তে পারেন

:: মুজতবা খন্দকার ::

বিভক্তির ঘেরাটোপে বাংলাদেশ। এই বিভক্তি যতদিন অামরা কাটিয়ে উঠতে না পারবো,ততদিন কোনো অান্দোলনই ন্যয্যতার মাপকাঠিতে উৎরাবেনা।অামরা সবাই কোনো না কোন ব্রাকেটে অাবদ্ধ হয়ে অাছি।এই যে ধরুন, রোজিনা ইসলাম কান্ড পাঁচদিন পার হতে চললো। কিন্তু সাংবাদিকদের নেতা বলে সমাজে যারা প্রতিষ্ঠিত,তাদের কোনো ভূমিকা অামার চোখে পড়েনি। না মাঠে,না বিবৃতির মাধ্যমে। কোথাও নয়। যারা এখন অান্দোলন করছেন, এদের বেশীরভাগই রোজিনার মাঠের সহকর্মী। কিন্তু সিনিয়র সাংবাদিক নেতারা কোথায়? ইকবাল সোবহান চৌধুরী,মনজুরুল অাহসানবুলবুল, ওমর ফারুক নাম বললে অারো অনেকের নাম চলে অাসবে। তালিকা বাড়াতে চাইনা। শুধু বলতে চাই অামাদের সিনিয়র এই সব অগ্রজরা কোথায়? এই সংকটে তাদের ভূমিকাটাই বা কি?প্রথমে বলছিলাম, অামরা এই পেশার সবাই একটি লক্ষনরেখার মধ্যে অাটকে অাছি,কোনোভাবেই সেই লক্ষনরেখার বাইরে যেতে পারছিনা। হয়তো অামাদের চেষ্টাটাও নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অামরা বড় বেশী অন্ধ হয়ে গেছি। অামরা অামাদের পেশার কমিটমেন্টটা হারিয়ে ফেলেছি। অামরা বড্ড এক চেোখা হয়ে পড়েছি। অামরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই,কিন্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাইতে অামরা দ্বিধা করি। অামরা অাইনের শাসনের কথা বলি, কিন্ত সেই জন্য যেটা করা দরকার সেটা করিনা।

এই সরকার ৯৬ তে ক্ষমতায় এসে ট্রাস্টের পত্রিকা দৈনিক বাংলা,টাইমস,বিচিত্রা,অানন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দিয়েছিলো। অামি তখন দৈনিক বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ছিলাম। পেশার শুরুতে একটি বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি অামাকে হতে হয়েছিলো। অার শেখ মুজিবের বাকশালের সময় সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টা তো এখন ইতিহাসের অংশ। অার তার শাসনামলে জাসদের গণকন্ঠ পত্রিকার অবস্থা একবার প্রবীনরা স্মরন করুন। সম্পাদক দেশের অন্যতম প্রধান কবি অাল মাহমুদকে কতখানি নিগৃহিত হতে হয়েছিলো। অার তাই এখন যখন শুনি, অাওয়ামী লীগ গণমাধ্যমবান্ধব, তখন কেবলি অামার হাসি পায়!

সুশাসন চাই অথচ সুশাসনের জন্য অামাদের রাষ্ট্রযন্ত্রকে কোনে তাগাদা দেইনা। অামরা মুক্তভাবে লেখার স্বাধীনতা চাই অথচ নির্বতনমূলক ডিজিটাল নিরাপত্ত্বা অাইন বাতিল চাইনা। অাজকের যে প্রতিবাদী কন্ঠ,রোজিনার জামিন হবার পর সেটা যে থিতিয়ে অাসবেনা,সেটারই বা কি গ্যারান্টি অাছে। অামাদের অান্দোলনের রুপ রঙও ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে বদলায়। যেমন প্রবীন সম্পাদক অাবুল অাসাদকে যেভাবে পুলিশ এবং কথিত মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ছেলেরা তার কমর্স্থল থেকে টেনে হিচড়ে বের করে নিলো,তিনি দীর্ঘ এক বছরেরও বেশী সময় কারাভোগ করলেন, তাতে কি অামাদের কারো কিছু এসে গেছে? এই যে সাংবাদিক নেতা রুহুল অামিন গাজি জেলে পচছেন.. তার জন্য অামরা সম্মিলিতভাবে কি করেছি। একদিনের জন্যও রাস্তায় নেমেছি? মাহমুদুর রহমানকে দিনের পর দিন রিমান্ডে জেলে নিয়ে নৃসংস অত্যাচার করা হয়েছে। তার পক্ষে সেদিন কেউ কি দাঁড়িয়েছিলাম অামরা। বরং বাইচান্চ সস্পাদক বলে তাকে কঠাক্ষ করেছি। তিনি বীরের মত একা রাষ্টযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে,না পেরে দেশান্তরি হয়েছেন। তার পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অার ফটো সাংবাদিক কাজলের ওপর দিয়ে যেভাবে অবর্ননীয় অত্যাচার চালানো হলো,তার জন্যইবা অামরা কতদুর কি করেছি। অামরা তখন নিজেদের গাঁ বাচিয়ে চলেছি। অার সাগর রুনি দম্পতির পরিনতি অামরা দেখেছি। ৪৮ ঘন্টার কথিত তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অাশ্বাস এখন অমর বাণীতে পরিনত হতে চলেছে। অামরা সবাই ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে। কিন্ত কখনো কালেকটিভলি কিছু চিন্তা করিনি,এখনো করিনা।রোজিনা ডামাডোলে হেফাজতের একজন বর্ষিয়ান অালেম যে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় মারা গেলো.. তার জন্য সুশীল সমাজ কিম্বা সমাজের অগ্রসর শ্রেনীর কি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখলামনা! অথচ অামরা এর চেয়ে ঢের প্রতিক্রিয়া দেখেছি অন্য অনেক ক্ষেত্রে। তাই বলি, সমাজের সব ক্ষেত্রে বিভাজন,স্বার্থপরতা, অামাদের লোক নয়তো ওদের লোক এই বিভক্তিটা চলে এসেছে। অার সেকারনে কারো গ্রেফতারে বজ্রকঠোর অান্দো্লন হয়,অার কারো জন্য কাছের পাতাটিও নড়তে দেখিনা। এই বাস্তবতা অস্বিকার করি কিভাবে.. যখন এমনটা দেখি তখন দু:খ হয় বৈকী!মনে পড়ে মাসুদা ভাট্টির কথা। তাকে দেশের সিনিয়র সিটিজেন প্রবীন অাইনজীবী ব্যারি্ষ্টার মইনুল হোসেনের টকশোতে একটি উক্তি কি প্রতিক্রিয়াটাই না সৃষ্টি হয়েছিলো। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এতে সরব হয়েছিলেন। অথচ সাংবাদিক রোজিনাও নারী। তাকে যেভাবে হেনস্থা করা হলো,কই তার জন্য কেনো নারীবাদীকে টু শব্দটি করতে শুনলামনা। প্রথম অালো তো সুশীল ঘরানার পত্রিকা। এই পত্রিকা তো তাদের কমবেশী পৃষ্ঠপোষকতা দেয়,তাহলে তারা চুপ কেন? চুপের অর্থ হচ্ছে, রোজিনা নারী কিম্বা তিনি সাংবাদিক তার পত্রিকা,স্টার কিম্বা অালো যাই হোকনা কেন?তাকে তো সরকার অভিযুক্ত করেছে..সুতারাং এই সরকারের বিরোধীতা একদম করা যাবেনা। অামি এক সময় টকশো করতাম। তো একদিন গেষ্ট হিসেবে এনেছিলাম,অাইন শালিস কেন্দ্রের নুর খানকে। টকশোর অাগে নানা অালাপ হচ্ছিলো, কথা প্রসঙ্গে উঠলো সুলতানা কামালের কথা। তখন সুলতানা কামাল অাইন শালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পদে নেই। কেন নেই জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার বাসার গৃহপরিচারিকাকে নির্যাতন করেছে কে বা কারা, এটার কারনে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়িয়েছেন। তার বাসার কাজের মহিলাকে নিশ্চই প্রতিবেশী কেউ নির্যাতন করতে অাসেনি। নুর খান অারো বললেন, উনারা ততটুকু এই সরকারের বিরোধীতা করেন,যতটুকু সরকার সহ্য করতে পারে। কারন সুলতানা কামালরা মন্দের ভালো হিসেবে দিনশেষে অাওয়ামীলীগকেই পছন্দ করে। সেদিন অামাদের এসব কথোপকোথনে অব দ্য রেকর্ডের কোন কিছু ছিলোনা বলে বিশেষ পরিস্থিতে প্রকাশ করলাম।সুতরাং এভাবে যদি মনপসন্দ সরকার ক্ষমতায় থাকলে, অান্দোলন এক রকম হবে,অার না থাকলে অন্যরকম। একবার মহিলা পরিষদের কথা না হয় ভাবুন,রোজিনা ইস্যুতে তারাইবা কোথায়। অামি যতদুর জানি মতিউর রহমানের স্ত্রী মালেকা বানু এই পরিষদের সাথে যুক্ত। তাহলে তারা কেন, নেই,এই সময়ে?এই যে মনমানসিকতার দ্বিচারিতা! এটাকে অামরা কিভাবে বদলাবো,এটাতো অামাদের মজ্জায় মিশে অাছে..!কথায় অামরা বলি, গণমাধ্যমবান্ধব সরকার। তাহলে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ভাড়া পরিশোধ করতে পারোলনা বলে তাদের ট্রান্মমিটার বন্ধ করে দিতে হবে? গণমাধ্যমের প্রতি একটু সংবেদন হওয়া গেলোনা? একবারও ভাবলোনা,ওই দুটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শতশত কর্মীদের রুটুরুজির কি হবে? এই দুটি চ্যানেলের বকেয়া না পেলে কি সরকার চলবেনা? কিন্তু সেটা কেউ ভাবেনি, অথচ অামরা সরকার গণবান্ধব বলে তার স্বরে চিল্লাচ্ছি। অন্যদিকে তার বংশবদ মিডিয়ার কোন অাওয়াজ অাছে কিম্বা সেইসব নেতাতের! কিন্তু এটাকি গণমাধ্যম সরকারের কাজ?এই সরকার ৯৬ তে ক্ষমতায় এসে ট্রাস্টের পত্রিকা দৈনিক বাংলা,টাইমস,বিচিত্রা,অানন্দ বিচিত্রা বন্ধ করে দিয়েছিলো। অামি তখন দৈনিক বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ছিলাম। পেশার শুরুতে একটি বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি অামাকে হতে হয়েছিলো। অার শেখ মুজিবের বাকশালের সময় সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টা তো এখন ইতিহাসের অংশ। অার তার শাসনামলে জাসদের গণকন্ঠ পত্রিকার অবস্থা একবার প্রবীনরা স্মরন করুন। সম্পাদক দেশের অন্যতম প্রধান কবি অাল মাহমুদকে কতখানি নিগৃহিত হতে হয়েছিলো। অার তাই এখন যখন শুনি, অাওয়ামী লীগ গণমাধ্যমবান্ধব, তখন কেবলি অামার হাসি পায়!!

লেখকঃ বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের বার্তা সম্পাদক

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

eight − six =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা