28 C
Dhaka
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১

বিভূঁই বীরের ৭১

যা পড়তে পারেন

:: ওয়াসিম ইফতেখার ::

অর্লি বিমানবন্দর, প্যারিস

৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১

ব্যাগে বোমা ও হাতে রিভলবার নিয়ে ফ্রান্সের প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দরে দাঁড়ানো একটি বোয়িং ৭২০ বিমানের ককপিটে উঠে পড়েন তিনি।

বিমানের দরজা বন্ধ হবার কিছুক্ষণ পর ১১.৩০ মিনিটে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের Boeing 720-040 B, PIA Flight No PK- 712  এর পাইলটের মাথা বরাবর নাইন  এম এম পিস্তল তাক করেন। হাতের ব্যগ দেখিয়ে জানিয়ে দেন এর ভেতর ডাইনামাইট ঠাসা। 

তাঁর ডিমান্ড মত মাত্র ২০ টন জরুরী ঔষধ পূর্ব পাকিস্তানের নিপিড়ীত জনতাকে এই বিমানেই সরবরাহ না করা হলে এই ডাইনামাইট চার্জ করে গোটা বিমান উড়িয়ে দেয়া হবে।

ফ্রেঞ্চ তরুন জাঁ ক্যুয়ে বিমান হাইজ্যাকের উদ্দেশ্য ছিল ৭১ এ বাংলাদেশী শরনার্থীদের জন্য জীবন রক্ষা কারী ঔষধের চালান নিশ্চিত করা।  তবে বিচার হয়েছিল তার। ৫ বছরের জেল দিয়েছিল আদালত। অবশ্য ৭৩ সালে তিনি মুক্তি পেয়ে যান। 

জিম্মি যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্যার কথা চিন্তা করে সরকার উক্ত হাইজাকারের শর্তে রাজি হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণের ভেতর চাহিদার বড় একটা অংশ এয়ার পোর্ট টার্মিনালে হাজির করা হয়। 

প্রথম কনসাইনমেন্টের ঔষধের চালান নিশ্চিত হবার পরে হাইজ্যাকার জাঁ ক্যুয়ে বিমানে অবস্থান নেওয়া শিশু ও বাচ্চাদের বিমান থেকে নামিয়ে নিরাপদে চলে যেতে দেয়।

মাত্র ২৮ বছর বয়সের এই  উদ্ধত ফ্রেঞ্চ তরুণের নাম জ্যা কুয়ে। প্রায় সম্পূর্ণ হাইজ্যাকটি ভিডিও ক্যামেরাতে ধারণ করা হচ্ছিল। 

ফ্রেঞ্চ সংবাদের লিংক দেখে নিতে পারেন।https://news.google.com/newspapers?nid=1873&dat=19711204&id=tfsoAAAAIBAJ&sjid=vNEEAAAAIBAJ&pg=3620,1220139

বিমানে সে নিজেই কয়েকজন সাংবাদিক কেও তুলে নেয় , যারা ঘটনাটি ভিডিও করেছিল। বাকী প্যাসেঞ্জারদের প্যারিসে নামিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেয় জাঁ ক্যুয়ে। প্যারিসে যখন ২য় চালান ঔষধের বহর বিমানে তোলার ব্যবস্থা হচ্ছিল। মালামাল তোলা পর্যবেক্ষনে জাঁ ক্যুয়ে ব্যাস্ত হয়ে পরলে এই সুযোগটি গ্রহণ করে পুলিশ। ট্রাক ভর্তি যে ঔষধ বিমানে নিয়ে আসা হচ্ছিল সেই ট্রাক ড্রাইভারের ছদ্ম বেশে পুলিস অফিসাররা বিমানের কার্গো বক্স ও ককপিটে পৌঁছে যায়।

মাত্র ২৮ বছর বয়েসে অতীতে কোন ধরনের ক্রিমিনাল রেকর্ড না থাকার পড়েও বিমান হ্যাইজ্যাকের অপরাধে তাঁকে জেলের ভাত খাওয়া লাগে।

বিমানের একজন যাত্রী তাঁর ইন্টারভিউ এ বলেন হাইজ্যাকার দারুণ ইয়াং ছেলে ছিল। খুব ভদ্র ব্যবহার । আমাদের সে বলে তোমরা লাঞ্চ করে নাও। ছোট বাচ্চা একটা মেয়ে ভয় পেলে সে তাঁকে আদর করে বলে ভয় পাবার কোন কারণ নেই।

এক কার্গো ঔষধ যোগাড় করতেও তো সময় লাগে। কিন্তু কুয়ে ছিলেন নাছোড়বান্দা। তাই অন্য একটি কার্গো বিমানে লোড করা মেডিসিন তখন জ্যা কুয়ের বিমানে সরবরাহ করা হচ্ছিল। তবে প্রশাসন জানিয়ে ছিল যে হাইজ্যাকারের দাবী মত, অন্য একটি ঔষধের কার্গো তাঁরা ঠিকি পূর্ব পাকিস্থানে নির্যাতিত মানুষের জন্য পাঠাবে , এবং তা আজকেই। 

কিন্তু বিধি বাম। বিমানে ঔষধ বোঝাই করার মুহূর্তে মেকানিকের ছদ্মবেশে ২জন পুলিশ উঠে ককপিটে গিয়ে জ্যঁ ক্যুয়েকে আক্রমণ করে বসে এবং কিল-ঘুষিতে কাবু করে গ্রেপ্তার ফেলে। 

জ্যা কুয়ের ব্যগেও কোন বোমা ছিল না। ছিল কিছু বৈদ্যুতিক তার, দুটো বই, এক কপি বাইবেল এবং একটি ইলেকট্রিক ট্রিমার। 

ফ্রেঞ্চ তরুন জাঁ ক্যুয়ে বিমান হাইজ্যাকের উদ্দেশ্য ছিল ৭১ এ বাংলাদেশী শরনার্থীদের জন্য জীবন রক্ষা কারী ঔষধের চালান নিশ্চিত করা।  তবে বিচার হয়েছিল তার। ৫ বছরের জেল দিয়েছিল আদালত। অবশ্য ৭৩ সালে তিনি মুক্তি পেয়ে যান। 

জ্যা কুয়ের এই সামান্য ঘটনার প্রভাব কিন্তু মারাত্মক ছিল। 

তখনকার ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট পম্পিডুর সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সেদিন প্যারিসের অর্লি বিমানবন্দরে এসেছিলেন তদানীন্তন পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডিট। কিন্তু এই ঘটনার ফলে পরিত্যক্ত হয় সেদিনের আলোচনা। এই ঘটনা ফরাসি জনমত-কে প্রভাবিত করে। ফলে পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে বন্ধুরাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-কে সমর্থন না করে ভোটদানে বিরত থাকে ফ্রান্স। 

 এই ঘটনায় নিউ ইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করেছিলঃ

Paris Police Thwart Airliner Hijacking: https://www.nytimes.com/1971/12/04/archives/paris-police-thwart-airliner-hijacking.html

জাঁ ক্যুয়ে কি সেদিন ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেছিল যে দেশের মানুষদের জন্য সে স্বার্থবিহীন বিমান হাইজ্যাকের ঝুঁকি নিয়েছিল , সেই দেশ টি আর মাত্র ১৩ দিন পরে স্বাধীন হবে?

জ্যা কুয়ে কি জানতেন তিনি যে ভুখন্ডের জন্য লড়াই করছেন সেই ভুখন্ডের কিছু লোক তখনো কলকাতায় মদ জুয়া আর নারী নিয়ে ব্যতিব্যস্ত সময় অতিক্রম করছে! 

জাঁ ক্যু তুমি জানোনা, সেই দেশের আজকের তরুণেরা আজো সংগ্রাম করে যাচ্ছে , খুন হচ্ছে ,গুম হচ্ছে , পুলিশের ডাণ্ডার আর টিয়ার শেলে জর্জারিত হচ্ছে । সেই দেশের মায়েরা আজো জানে না ছেলেটি তাঁর ঘরে ফিরে আসবে কিনা ? জাঁ ক্যুয়ে আমি লজ্জিত, আমাদের ক্ষমা কর তুমি যেই বাংলাদেশ চেয়েছিলে, আমরা তা গড়তে পারি নি।

বিদায় বিদায় এ অভাগা আজ নোয়াই শির।

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

5 × three =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা