28 C
Dhaka
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র অধিগ্রহণ

যা পড়তে পারেন

:: এরশাদ নাবিল খান ::

২০১৪ সালে ইউক্রেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ক্রিমিয়া ভোটের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সাথে মিশে গেছে। সমস্যার আপাত সূত্রপাত হয়েছিল ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ নিয়ে। কিন্তুু ইউক্রেনের শাসকরা বুঝতে পারেননি তাদের এই সিদ্ধান্তের অজুহাতে ক্রিমিয়া দখল করার জন্য রাশিয়া তৈরি হয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রিমিয়ায় বসবাসকারী রুশপন্থীদের রাশিয়া এমনভাবে প্রলুব্ধ করেছে যে যখন এ প্রশ্নে ভোটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভোট গ্রহণের গণতান্ত্রিকতার মাধ্যমেই ক্রিমিয়াকে অধিগ্রহণ করে নিয়েছে রাশিয়া।


গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি রাষ্ট্র অধিগ্রহণ কথাটি একটু অবাস্তব শোনালেও রাজনীতির পরিহাসে কোনো কোনো দেশ তথা রাষ্ট্রের ভাগ্যে তা ঘটে। গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের তথা জাতির ইচ্ছানুযায়ী দেশ চালানোর ব্যবস্থা। তাই জাতির ইচ্ছানুযায়ী যদি একটি রাষ্ট্র চলে তাহলে অধিগ্রহণ হয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকার কথা নয়। কোন জাতিই নিজেকে অন্যের হাতে তুলে দিতে পারেনা। রাষ্ট্র অধিগ্রহণ সম্ভব কেবল একটি জাতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন সরকার, ষড়যন্ত্রকারী ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা। এটাই বাস্তবতা। এভাবেই গণতন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্র অধিগ্রহণের মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধটি সংগঠিত হয়ে থাকে।

এশিয়ার একটি দেশ, সিকিমে নির্বাচিত গণপরিষদই দেশটিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে সোপর্দ করে দিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে এটা সম্ভব হয় কারণ কয়েক কোটি লোকের একটি জাতিকে কেনা বা বিভ্রান্ত করা খুব কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব হলেও দু-তিন শ’জনের একটি পার্লামেন্ট বা তার সংখ্যাগরিষ্ঠ কে কেনা বা বিভ্রান্ত খুব কষ্টকর নয়। আর দখলদার রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি হয় দুর্নীতিপরায়ণ, দেশপ্রেম বিবর্জিত, অশিক্ষিত বা লোভী তাহলে তো এ কেনাকাটা আরো সহজ হয়। আর এই সহজের ভেতর দিয়েই ঘটে সিকিম ও ক্রিমিয়া দশা তথা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র অধিগ্রহণ।

কখনো কখনো এক-একটি রাষ্ট্র জটিল সমস্যায় পড়ে যায়। তখন তার জন্য একদিকে খোলা থাকে গণতন্ত্রের মাধ্যমে দেশটাকে পরের হাতে তুলে দেয়ার পথ, অন্যদিকে থাকে স্থায়ীভাবে না হোক, দীর্ঘসময়ের জন্য গণতন্ত্রকে আপাতত বিসর্জন দিয়ে দেশকে স্বাধীন রাখা। এই দু’টিই অগ্রহণযোগ্য বিকল্প। কিন্তুু এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাটা যে কী কঠিন ও দুঃসহ তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। এরকম ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় প্রজ্ঞা এবং অত্যন্ত দ্রুততার সাথে। কারণ এ ক্ষেত্রে সামান্যতম ভুল হলে গোটা জাতির ভাগ্যেই নেমে আসতে পারে অবর্ণনীয় দুর্দশা ও দীর্ঘস্থায়ী দুঃখ — সোজা কথায় পরাধীনতা।

এ কারণে কোনো কোনো শাঁখের করাতে পড়া রাষ্ট্রের তথা জাতির পক্ষে উপরোল্লিখিত করুণ অবস্থায় সিদ্ধান্ত নিতে যাওয়াটা মৌলিকভাবে নতুন কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা শুধু এই যে, এখানে দুটো মন্দই প্রায় সমানে সমান। কোনোটাই কোনোটার চেয়ে কম নয়। কিন্তুু সিদ্ধান্তহীনতা বা পদক্ষেপ না নেয়ার সিদ্ধান্ত একধরনের মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। তাই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার বিপদ থাকলেও উল্লিখিত ওই একটি নিশ্চিত ভুল সিদ্ধান্ত বাতিল করে অন্য একটি সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। একজন বাস্তববাদী অবশ্য দুটো বা একাধিক অগ্রহণযোগ্য বিকল্পের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কেননা বাস্তব জগতে সম্ভবত কোনো কিছুই চূড়ান্তভাবে আদর্শ নয়। যখনই কোনো কিছু হাতের নাগালে পাওয়া যায় তখনই তা হয়ে থাকে মন্দের ভালো। মনকে একেবারে তৃপ্ত করে দেয়ার মতো আদর্শ তা হয়না। তাই বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত সবসময়ই হয় মন্দের পরিবর্তে ভালো গ্রহণের অথবা মন্দের পরিবর্তে অল্প মন্দ তথা মন্দের ভালো গ্রহণের সিদ্ধান্ত।


শুধু ভৌগোলিক আয়তন দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের শক্তি বা সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে যাচাই করা যায়না। জাতীয় শক্তি উপাদান বহু একটি উপাদানের অভাব অন্যান্য উপাদানের অতিরিক্ত ভালো অবস্থা দিয়ে পুষিয়ে নেয়া যায়। ক্ষুদ্র জাপান আয়তনের বিচারে তারচেয়ে তিরিশ গুণ বড় চীনকে বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে রীতিমতো অস্থির করে রেখেছিল। সেই সময় আয়তন ছাড়া শক্তি অন্যান্য উপাদান যথা মনোবল, জাতীয় চরিত্র, নেতৃত্বের গুণাবলী, উচ্চতর সামরিক সংগঠন, সামাজিক চরিত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাপান ছিল চীনের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর। একইভাবে ক্ষুদ্র বেলজিয়াম তার চেয়ে বাইশ গুণ বড় কঙ্গোকে বা ব্রিটেন সারা পৃথিবীময় তার বিশাল সাম্রাজ্যকে পদানত করে রাখতে পেরেছিল। তাই শুধু আয়তন কোনো রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষুদ্রতার নির্ধারক হতে পারেনা। কিন্তুু গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্র দখলকারী একটি রাষ্ট্র, তার দালাল ও চরেরা দখলকৃত রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মনে নিছক আয়তনগত ক্ষুদ্রতাকে কেন্দ্র করে এমন একটি ধারণার জন্ম দেয় যাতে তারা মনে করতে শুরু করে, জাতি ও রাষ্ট্র হিসেবে এত বিশাল একটি মারমুখী রাষ্ট্রের সামনে টিকে থাকাটা সম্ভব নয়, তাই সে চেষ্টা করাটা বৃথা ও অবাস্তববাদী প্রচেষ্টা। কখনো কখনো একটি জাতির মনে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে হীনমন্যতা সৃষ্টি করা হয়। বিদেশী অঞ্চল, নগর ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রটির জাতীয় সাংস্কৃতিক আদর্শ বলে বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি করা হয়।


সবচেয়ে মারাত্মক যে কাজটি করা হয় তা হলো, যে রাষ্ট্রটিকে গিলে ফেলা হবে তার অর্থনীতিকে যতখানি সম্ভব পক্ষ করে ফেলা হয়, যাতে একসময় ওই রাষ্ট্রটির জনগণ দখলদার রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে এবং মনে মনে ভাবতে শুরু করে ওখানে মিশে গেলেই হয়তো নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হবে। তারা তখন বোঝে না যে এপার আর ওপারের সমৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক অবস্থার যে তারতম্য তা ওপারের অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সৃষ্ট এপারের অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের ফল এবং ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে পারলেই ওপারের চেয়েও এপার অধিক উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে। 

কোনো জাতিই স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে চায় না। অর্থনৈতিক দুর্দশার চরমে না পৌঁছালে কোনো জাতিই কোনোক্রমেই অন্যের পরাধীনতার কথা মেনে নিতে পারেনা। এরূপ চিন্তা করতে বাধ্য করার জন্য বৃহৎ রাষ্ট্রটিকে অনেক ফাঁদে পড়তে হয়। দরকার হলে নদীর গতি বন্ধ করে দিয়ে গণহত্যার মতো পরিস্থিতি পর্যন্ত সৃষ্টি করতে হয়। কৃষিজমিকে মরুভূমি বানানো, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কোনো কোনো দেশে তার ভিত্তিরূপ নদীনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থাটিকে ধ্বংস করে ফেলতে হয়। অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে রেললাইন, পুল, শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি ধ্বংস করার ব্যবস্থা করতে হয়।


বিভিন্ন উপায়ে দখলদার রাষ্ট্রটি ছোট রাষ্ট্রটির জনগণের মনে নিজেদের আত্মরক্ষার ব্যাপারে চূড়ান্ত হতাশাবাদ, সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বৃহত্তর রাষ্ট্র সম্পর্কে ভক্তিবাদ ও বৃহৎ রাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক উন্নতির ব্যাপারে ঈর্ষার সৃষ্টি করে। আর তখনই ছোট রাষ্ট্রটির জনগণ মানসিক রোগীর মতোই আত্মহত্যার জন্য পাগল হয়ে পড়ে। তখন গণতান্ত্রিক উপায়েই তারা নিজেদের রাষ্ট্রকে প্রতিবেশী বা বৃহত্তর রাষ্ট্রটির হাতে তুলে দেয়। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের শেষদিকে নাৎসি জার্মানির মুখে নার্ভাস অস্ট্রিয়া যে নিজেকে তথাকথিত ‘রাখীবন্ধন ‘চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির হাতে তুলে দিয়েছিল, তা এরকম একটি পরিস্থিতির উদাহরণ।


তাঁবেদার সরকার উৎখাত পরবর্তী তথা বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিকভাবে দেশ অধিগ্রহণ করা অনেক সহজ। এখানে দীর্ঘ সাধনার বা সময়ের প্রয়োজন হয় না। বরং ঘুঁটিটা ঠিকমতো চাললে প্রায় রাতারাতিই কাজ হাসিল হয়ে যায়। একটি ক্ষমতাসীন সরকার, বিশেষ করে তা যদি হয় নির্বাচিত এবং একনায়কমূলক তাহলে তার দলে বিস্তৃতি, সাংগঠনিক শক্তি, অর্থনৈতিক ভিত্তি সবকিছুই অন্য যেকোনো দলের চেয়ে ব্যাপক ও শক্তিশালী হওয়ার কথা। সে সরকারটি উৎখাত হয়ে গেলেও অবকাঠামো তে তার সেই ব্যাপক ও বলবান সংগঠনের শিকড় থেকে যায়। অন্যদিকে নতুন সরকারের ছত্রছায়ায় অন্য দলগুলো হয়তো নিজেদের সংগঠনগুলোর ক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সুযোগ পায়। কিন্তুু দীর্ঘকাল ধরে একটি একনায়কত্বমূলক সরকারের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা ও জেঁকে বসা দলের সংগঠন ও শক্তির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠা তাদের পক্ষে অল্প সময়ে সাধারণত কখনোই সম্ভব হয় না। এসবের সুযোগ নিয়ে দখলদার রাষ্ট্রের তাঁবেদার দলটি তাই ভোটের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় চেপে বসতে পারে। তখন তারা আবার তাঁবেদারি শুরু করে দেয় বা দিতে পারে। কেননা তাঁবেদারিতেই তাদের কায়েমি স্বার্থ নিহিত থাকে। তাই জনগণের অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্বাচিত সরকারই অনেক সময় দেশকে পররাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়— কখনো গোপন কয়েকটি চুক্তির ধারা মতো পর্যায়ক্রমে ও অলক্ষ্যে, কখনো সরাসরি শান্তি রক্ষার জন্য সৈন্য পাঠানোর আকুল আবেদন জানিয়ে, কখনো বা বৃহত্তর রাষ্ট্রটির সহযোগী রাজ্যের মর্যাদা দানের সুপারিশ করে দেশকে বিক্রি করে দিতে পারে।


এশিয়ার একটি দেশ, সিকিমে নির্বাচিত গণপরিষদই দেশটিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে সোপর্দ করে দিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে এটা সম্ভব হয় কারণ কয়েক কোটি লোকের একটি জাতিকে কেনা বা বিভ্রান্ত করা খুব কঠিন এবং প্রায় অসম্ভব হলেও দু-তিন শ’জনের একটি পার্লামেন্ট বা তার সংখ্যাগরিষ্ঠ কে কেনা বা বিভ্রান্ত খুব কষ্টকর নয়। আর দখলদার রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যদি হয় দুর্নীতিপরায়ণ, দেশপ্রেম বিবর্জিত, অশিক্ষিত বা লোভী তাহলে তো এ কেনাকাটা আরো সহজ হয়। আর এই সহজের ভেতর দিয়েই ঘটে সিকিম ও ক্রিমিয়া দশা তথা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র অধিগ্রহণ।

লেখকঃ অনলাইন এক্টিভিস্ট ও ব্লগার

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

eleven − 1 =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা