27 C
Dhaka
শনিবার, জুলাই ৩১, ২০২১

লকডাউন ও মসজিদে নামাজ প্রসঙ্গে

যা পড়তে পারেন

:: হুমায়ূন কবির ::

গত শুক্রবার বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদে দেখলাম পাড়া মহল্লার বিভিন্ন মসজিদে মুসল্লিরা ভিড় জমান। অনেকেই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করেন এবং জুম্মার নামাজ আদায় করেন। বেশি লোকের ভিড় দেখে কোনো কোনো মসজিদের গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর লোকজন ফিরে আসে এবং ফিরে আসার সময় তারা আবার মহল্লার গলিতে দাঁড়িয়ে গল্প করেন। এই লোকদের কাফেলায় কিছু তরুণ ও কিশোরদের দেখা যায়। অনেকেরই মূল উদ্দেশ্য, নামাজের দোহাই দিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া।


গত ১০ এপ্রিল সরকার খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ নামাজে অনধিক ২০ জন মুসল্লি শরিক হতে পারবেন বলে বিজ্ঞপ্তি জারী করেন (যদিও মুসুল্লি সংখ্যা নির্ধারণ করা উচিৎ ছিল মসজিদের ধারণ ক্ষমতার উপর)। এই সংখ্যা জানার পরও লোকজন জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদে ভিড় করেন। জামাতে লোক নির্ধারণের এ ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায় কিছু মানুষ ছাদে যেয়ে জামাতে নামাজ পড়ছেন যার নিচে ক্যাপশন লিখেছে-‘ সরকার বন্ধ করেছে তো কি হয়েছে আমরা জামাত বন্ধ করবে না’। কোনো কোনো জমায়েতে এমনও বলা হয়েছে যে, ‘যারা এই জামাতে যোগ দিয়েছেন তারা করোনা মুক্ত। তাদের করোনা ধরতে পারবে না’। কিছু জায়গায় ওয়াজ ও জমায়েতে বলা হয়েছে-‘ বাংলাদেশে কোনদিন করোনা আসবে না। ওটা শুধুমাত্র বিধর্মীদের জন্য’।

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা না মানি ধর্ম, না মানি বিজ্ঞান। তাই বিজ্ঞান বারবার হাত ধুতে বললে আমরা তা করি না, যাই থানকুনি পাতা খেতে। অথচ ধর্মেও বলা আছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা। পাঁচবার নামাজ পড়লেও পাঁচবার হাত ধোয়া হয়ে যায়। অসুস্থ হলে বিজ্ঞান আর ধর্ম দু’জায়গাতেই বলা হয়েছে ঔষধের কথা, যথাযথ চিকিৎসার কথা অথচ আমরা অসুস্থ হলে যাই ঝাড়ফুক আর তাবিজ-কবজের নিতে। এভাবে আমাদের জীবনধারণে ধর্ম আর বিজ্ঞান দুটোই উপেক্ষিত থাকে।


ধর্মকে নানাভাবে ব্যবহার করে, মনগড়া ফতোয়া আর বয়ানে এদেশের সাধারণ মানুষের বোধবুদ্ধিকে বিভ্রান্ত ও মিথ্যায় আচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে অনাদিকাল থেকে। ফলে ধর্মের মূল বাণী আমাদের কাছে পৌঁছচ্ছে না এবং প্রকৃত ধর্ম যা তা পালন করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।


বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মভীরু এবং একই সাথে তারা অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তাই তাদের সহজেই বিভ্রান্ত করা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা যারা নিজেদের শিক্ষিত বলে দাবি করি তারাও ধর্মের মূলভাব বুঝিনি বা বুঝেও গ্রহণ করতে পারিনি। গত শুক্রবার যারা জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন এবং যারা মসজিদে ঢোকার জন্য জোর করছিলেন তাদের সবাই কিন্তু অশিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত নন। অন্য মহল্লার কথা জানা নেই, কিন্তু আমার মহল্লায় যাদের দেখেছি তাদের অনেকেই শিক্ষিত।


করোনা উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দেরিতে প্রবেশ করেছে। সেই সময়টায় বিশ্ব বাস্তবতায় জানা গেছে করোনার কোনো কার্যকর ঔষধ বা প্রতিশেধক এখনও আবিষ্কার হয়নি, একমাত্র কার্যকর ব্যবস্থা হচ্ছে সঙ্গ নিরোধ।

সঙ্গ নিরোধের জন্য প্রয়োজন সব ধরনের গণজমায়েত পরিহার।  হাদিসে আছে, এক ঝড়-বৃষ্টির দিনে ইবনু ‘আব্বাস (রা.) আমাদের উদ্দেশে খুতবাহ দিচ্ছিলেন। মুয়াজ্জিন যখন ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ পর্যন্ত পৌঁছল, তখন তিনি তাকে বললেন, ঘোষণা করে দাও যে, ‘সালাত যার যার আবাসস্থলে’। এ শুনে লোকেরা একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলো- যেন তারা বিষয়টাকে অপছন্দ করলো। তিনি তাদের লক্ষ্য করে বললেন, মনে হয় তোমরা বিষয়টি অপছন্দ করছ। তবে, আমার চেয়ে যিনি উত্তম ছিলেন অর্থাৎ আল্লাহর রসূল তিনিই এরূপ করেছেন। একথা সত্য যে, জুমু‘আর সালাত ওয়াজিব। তবে তোমাদের অসুবিধায় ফেলা আমি পছন্দ করি না সহিহ বুখারী : ৬৬৮।


ইবনু উমার (রা.) একদা তীব্র শীত ও বাতাসের রাতে সালাতের আযান দিলেন। অতঃপর ঘোষণা করলেন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ আবাসস্থলে সালাত আদায় করে নাও, অতঃপর তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল প্রচণ্ড শীত ও বৃষ্টির রাত হলে মুয়াজ্জিনকে এ কথা বলার নির্দেশ দিতেন- ‘প্রত্যেকে নিজ নিজ আবাসস্থলে সালাত আদায় করে নাও’ ( সহিহ বুখারী )
এই হাদিসের ভিত্তিতে কুয়েতে আজানের বাক্যও পরিবর্তন করা হয়েছে।

মুআজ্জিন যখন ‘হাইয়া ‘আলাস্ সালাহ’ বলেন সেখানে শোনা যাচ্ছে ‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ অর্থাৎ তোমরা বাড়িতেই সালাত আদায় করো। মহামারীর বিষয়েও হাদিসে বলা হয়েছে,‘ কোনো এলাকায় মহামারির সংবাদ শুনলে তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে না। আর কোনো এলাকায় থাকা অবস্থায় যদি মহামারি শুরু হয়, তবে তোমরা সেখান থেকে পলায়নও করবে না’ (সহিহ বুখারী : ৫২৮৭; সহিহ মুসলিম : ৪১১১)


অর্থাৎ সারা বিশ্ব জুড়ে এখন যে কোয়ারেনটাইনের কথা বলা আছে সেটিই বলে গেছেন মহানবী। অথচ আমরা নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে ভিড় করেছি এবং অবিবেচকের মতো এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছি। 
‘তোমরা নির্দেশ পালন করো আল্লাহ, রসূল ও তোমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানদের’- (সুরা নিসা : ৪৯)।


‘তোমরা আমির ও শাসকের কথা শুনবে এবং মান্য করবে। যদিও হাবশি গোলামকে শাসক বানিয়ে দেওয়া হয়’- (বুখারী: ৭১৪২)।শুধু তাই নয় ইসলামে জাতিগত ঐক্য বিনষ্ট ও অনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেবার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ‘নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, সামনে অনেক মন্দ বিষয়াবলী ঘটবে। কাজেই যে ব্যক্তি জাতির ঐক্যবদ্ধ থাকাবস্থায় অনৈক্য সৃষ্টি করবে, তরবারি দ্বারা তার মাথা উড়িয়ে দাও। সে যেই হোক না কেন’- (মুসলিম : ৪৭৫৯)


বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। এটা যে একটা অতি সংক্রামক এবং ভয়ানক রোগ সেটা নিয়ে কিছু বলাই বাহুল্য। বলা হচ্ছে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্বই এই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। মহামারীর বিষয়ে বিজ্ঞান যে পন্থা অবলম্বনের কথা বলছে ধর্মের সাথে তার কোনো সংঘাত নেই বরং মিল আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমরা বিজ্ঞানের কথা তো শুনছিই না, এমনকি কি যারা খুব ধর্মবোধ দেখাচ্ছি তারা ধর্মের কথাও মানছি না।


ইসলামিক দেশগুলি কতখানি ইসলামিক নিয়ম মানেন এ নিয়ে গবেষণা করেন জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হুসেন আসকারী। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় ইসলামের যে বিধান তা প্রতিদিনের জীবনে কোন দেশগুলো মানেন এমন একটি স্টাডিতে দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি ইসলামিক বিধান মেনে চলা দেশ হচ্ছে নিউজিল্যান্ড, দ্বিতীয় অবস্থানে লুক্সেমবার্গ। তারপর পর্যায়ক্রমে আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও কানাডা। মালয়েশিয়া ৩৮তম, কুয়েত ৪৮তম, বাহরাইন ৬৪তম এবং সৌদি আরব ১৩১তম অবস্থানে। গ্লোবাল ইকোনমি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান সৌদি আরবেরও নীচে।


গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মুসলমানরা নামাজ, রোজা, হজ্জ, জাকাত, সুন্নাহ, কোরআন, হাদিস, হিজাব, দাড়ি, লেবাস নিয়ে অতি সতর্ক কিন্তু রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে ইসলামের আইন মেনে চলে না।


গবেষণার এই ফলাফল ছাড়াই ব্যক্তি ও সমাজজীবনের নিরীক্ষা থেকে নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, ধর্ম নিয়ে আমরা যতটা উন্মাদনা দেখাই ঠিক ততোটাই তা মেনে চলি না আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে। মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়, হালাল খাবার নিয়ে এত সর্তকতা দেখাই কিন্তু হারাম ঘুষ খাবার ব্যাপারে আমাদের আগ্রহের কোনো কমতি নেই, আমরা ত্রাণ লুটে খাই। আমরা যদি ধর্মই মানতাম তাহলে ধর্ম নিয়ে এত ব্যবসা আর ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষকে এত ঠকাতে পারতাম না।


আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা না মানি ধর্ম, না মানি বিজ্ঞান। তাই বিজ্ঞান বারবার হাত ধুতে বললে আমরা তা করি না, যাই থানকুনি পাতা খেতে। অথচ ধর্মেও বলা আছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা। পাঁচবার নামাজ পড়লেও পাঁচবার হাত ধোয়া হয়ে যায়। অসুস্থ হলে বিজ্ঞান আর ধর্ম দু’জায়গাতেই বলা হয়েছে ঔষধের কথা, যথাযথ চিকিৎসার কথা অথচ আমরা অসুস্থ হলে যাই ঝাড়ফুক আর তাবিজ-কবজের নিতে। এভাবে আমাদের জীবনধারণে ধর্ম আর বিজ্ঞান দুটোই উপেক্ষিত থাকে।


ইসলাম শুধু আচার অনুষ্ঠানের নয়, এটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। ইসলাম বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম। বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের কোনো কোনো বিষয়ে কিছু দ্বিমত এবং বিতর্ক থাকলেও আমাদের জীবন-যাপনে বিজ্ঞানের যে প্রয়োগ এবং তার মধ্য দিয়ে মানুষের যে কল্যাণ ও ভালো থাকা তার সাথে ধর্মের খুব বড় কোনো ক্লেশ নেই বরং বিজ্ঞানের অনেককিছুই ধর্মের মধ্যেও বিদ্যমান। শুধুমাত্র ধর্মের মূল জায়গাটিকে আমরা চিহ্নিত করতে পারিনি। যদি আমরা ধর্মের মূল কথাগুলিও মানতে পারতাম, সঠিকভাবে ধর্মের চর্চা করতে পারতাম তাহলেও সমাজের এতো অধঃপতিত মুখ দেখতে হতো না। ধর্ম যে শুধু লৌকিকতা আর আচার অনুষ্ঠানের নয়, এটি আমাদের আত্মিক শুদ্ধি ও এবং নৈতিক উন্নয়নের এটি আত্মস্থ করতে পারলেই আমরা ধর্মের মাধ্যমেও মানব কল্যাণ করতে পারতাম এবং বিজ্ঞানের মাধ্যমে ধর্ম অথবা ধর্মের মাধ্যমে বিজ্ঞানকে প্রতিদিনের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের মনের বিশ্বাস ধর্ম বা বিজ্ঞানের প্রতি নয়। আমাদের বিশ্বাস কুসংস্কার, গোঁড়ামি আর স্বার্থের দিকে।

আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে স্বার্থউদ্ধার আর অতি শর্টকাট রাস্তায় দ্রুত সব অর্জন করা। আল্লাহর বিধান মেনে আল্লাহর পথে হাঁটা এতো সোজা নয়, খুব কঠিন। প্রকৃতার্থে আমাদের মন প্রতারণাপূর্ণ। আমরা তাই প্রতিনিয়ত প্রতারণা করি নিজেকে, সমাজকে আর দেশকে।


অন্যদিকে, ব্যাংক, শিল্পকারখানা, হাটবাজার খোলা রেখে শুধু মসজিদে মুসুল্লিদের নিয়ন্ত্রণ করায় লকডাউন কার্যকরীতা নিতান্তই অসার।

লেখকঃ অনলাইন এক্টিভিস্ট, ব্লগার

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

seventeen − 3 =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা