28 C
Dhaka
বুধবার, জুন ২৩, ২০২১

সনাতনী হিন্দুরা গো-মাংস খেতেন!

যা পড়তে পারেন

:: হুমায়ূন কবির ::

উপমহাদেশে গরুর গোসত খাওয়ার প্রচলন মুসলমানরা করেনি বরং সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই উপমহাদেশে গরুর গোসত খাওয়ার প্রচলন করেছিল- যার অসংখ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ হিন্দু ধর্ম এবং ঐতিহাসিকদের লেখায় প্রমাণিত। এই বিষয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে বিরাট ইতিহাস হয়ে যাবে বিধায় অতি সংক্ষেপে কিছু বর্ণনা করতে চেষ্টা করবো। 


প্রথমেই বলবো, এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করে বই প্রকাশ করতে গিয়ে ভয়ানক বিপদে পড়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ ঝা। অসহিষ্ণু ধর্মান্ধ বিজেপি সমর্থকরা ‘অধ্যাপক নারায়ণ ঝা’কে বারবার মৃত্যুর হুমকি দিয়েছেন, ঈশ্বর নিন্দার কারণ দর্শিয়ে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে কোর্টের মাধ্যমে তার গবেষণার প্রকাশ বন্ধ করিয়েছে। পরবর্তীতে অধ্যাপক দ্বিজেন্দ্র নারায়ণ ঝা The Myth of the Holy Cow নামে তার গবেষণার সারবস্তু লন্ডন থেকে প্রকাশ করেন।


সম্প্রতি ভারতে গো-রক্ষার নামে যেভাবে মুসলমান হত্যা চলছে তা আধুনিক জগতে চরম নিন্দনীয় ও অকল্পনীয়। গোধুলিলগ্নে চারণভূমি থেকে গরু নিয়ে ফেরার সময় গো-হত্যার অভিপ্রায়ের অজুহাতে মুসলিম রাখাল বালক হত্যা, বাড়িতে গো-মাংস রাখার অভিযোগে পুরো মুসলমান পরিবারকে পুড়িয়ে মারার কর্মকাণ্ডে সারা পৃথিবী বিস্মিত, স্তম্ভিত।


প্রাচীন ভারতে গো-হত্যা ছিল ব্রাহ্মণ্য সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ
প্রাচীনকাল থেকে ভারতে গো-হত্যা ও গো-মাংস আহারের ব্যাপক প্রচলন ছিল উচ্চ ও নিম্নবর্ণের হিন্দু বাড়িতে, সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, ব্রাহ্মণ্য তুষ্টিতে এবং বিভিন্ন রাজকীয় ও ধর্মীয় গো-মেধযজ্ঞে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৬০০ শতাব্দীর সব ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ ও লোকসাহিত্যে উৎসব করে ভারতে গো-মাংস আহারের প্রমাণ পাওয়া যায় জন্মানুষ্ঠান, মহাব্রত, শ্রাদ্ধ ও ব্রাহ্মণ সেবায়। কাম সংহিতায় উল্লেখ আছে, তান্ত্রিক ব্রাহ্মণদের শারদীয় সেবা করতে হতো ১৭টি অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী খর্বকায় ষাঁড় এবং তিন বছরের কম বয়সী গো-শাবক হত্যা দিয়ে। অবশ্য ন্নিবর্ণের দরিদ্র হিন্দুদের কালভদ্রে গো-মাংস আহারের সৌভাগ্য হতো। চণ্ডাল ও অচ্ছুতদের গো-হত্যা করে গো-মাংস আহারের অধিকার ছিল না। তারা মৃত গরুর মাংস খেত এবং গরুর চামড়া দিয়ে জুতা ও অন্যান্য দ্রব্য তৈরি করত, তারা গরুর হাড়ের ব্যবহারও করত। এ প্রথা ভারতের নিম্নবর্ণের অচ্ছুত হিন্দুদের মধ্যে আজও বহাল আছে। পুষাণ দেবতার পছন্দ কালো গাই, রুদ্রের প্রিয় লাল গরু। বৈদিক দেব-দেবীরা বিভিন্ন গৃহপালিত প্রাণীতে অনুরক্ত ছিলেন। কেউ বা মহিষ, কেউ বা ছাগল, কেউ ভেড়ায়। ইন্দ্রের পছন্দ গোলাকার শিংযুক্ত ষাঁড় ও সাদা হাতিতে, অগ্নিদেবতার আকর্ষণ ছিল অশ্ব ও গো-মাংসে।


ঋগবেদে কি করে তলোয়ার বা কুড়াল দিয়ে গরু হত্যা করতে হবে এবং পরে রন্ধন করে ভোগ করতে হবে তার বর্ণনা আছে। বৈদিক ও বৈদিক পরবর্তী যুগে ভারতীয়রা গো-মাংস কেবল আহার করত তাই নয়, তাদের বিশ্বাস ছিল- পিতা-মাতার শবদেহ দাহনের সময় একই সাথে রিষ্টপুষ্ট ষাঁড় পোড়ালে মৃত ব্যক্তি ষাঁড়ে আরোহণ করে স্বর্গে প্রবেশ করতে পারবেন। এরূপ ঘটনার উল্লেখ আছে অর্থ বেদের বর্ণনায়।


ভারতে আগত আর্যরা ছিল যাযাবর এবং কৃষিতে অনভ্যস্ত। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০ থেকে কাজাকিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তুরস্ক ও পূর্ব ইউরোপের পোলান্ড, রুমানিয়া, শ্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, নরওয়ে প্রভৃতি দেশ থেকে আর্যরা ভাগ্যের অন্বেষণে স্থলপথে কয়েক হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছে। অবশ্য দ্রাবিড়রা ভারতে বসতি গড়েছিল আর্যদের আগমনের কয়েক হাজার বছর আগে ৮০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে।যাযাবর জীবনের পরিসমাপ্তিতে আর্যরা পরিচিত হয় সহজলভ্য খাদ্য হিসেবে গো-মাংসের সাথে। বৃহৎ জনবসতির কারণে ভারতে গৃহপালিত ষাঁড়, মহিষ, গরু ও ছাগলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল দ্রুত গতিতে।ব্রিটিশ প্রশাসক উইলিয়াম ক্রুক ১৮৯৪ সনে প্রকাশিত তার গবেষণা গ্রন্থ The Veneration of the cow in India তে দেখিয়েছেন, আর্যরা কেবল গো-মাংসভোগী ছিল তাই নয়, তাদের গো-মাংসে বিশেষ আশক্তিও ছিল।


মহাভারত ও রামায়ণ চরিত্রদের গো-মাংসপ্রীতি বিশেষভাবে প্রাণিধানযোগ্য। ধ্রুপদি দেবতাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ‘পঞ্চপাণ্ডবের বনবাসের অবসান হলে যুধিষ্ঠির সহস্র ষাঁড় ও গরু বলিদান করে দেবতাদের তুষ্ট করবেন।’ পঞ্চপাণ্ডবরা তাদের বনবাসকালে সহজলভ্য গৃহপালিত গো-মাংস সংগ্রহ করত এবং গো-মাংস আহারে তাদের শক্তি সঞ্চিত হতো, গোবর ও গোমূত্রের ব্যবহারও ছিল তাদের জীবনযাত্রায়। মহাভারতে আরো উল্লেখ আছে, রাজা রতিরতদেব প্রতিদিন সহস্র গরু জবাই করে ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিলি করে পুণ্য অর্জন করত।বাল্মিকীর রামায়ণে এ জাতীয় আরো ঘটনার বিবরণ আছে। জনশ্রুতি যে, ব্যাপক সংখ্যক গরু বলিদানের ফলে রাজা দশরথের সন্তান রামের জন্ম হয়। রাম পত্নী সীতা যমুনা নদী অতিক্রমকালে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘রাম তার পিতৃ আদেশ সফলভাবে পালন করতে পারলে তারা যমুনা নদীতে দেবীকে সহস্র গাই-গরু ও সহস্র ভাড় মদ উৎসর্গ করবে।’ অবশ্য সীতা নিজে গো-মাংসের চেয়ে হরিণের মাংস বেশি পছন্দ করত।


চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতায় ওষুধ হিসেবে গো-মাংস আহার এবং গোমূত্র সেবনের উপকারিতার বিবরণ আছে। গরুর লেজ ও হাড়ের ঝোলের বিধান আছে বিভিন্ন প্রদাহের চিকিৎসা হিসেবে। চরম সর্দি, সাধারণ জ্বর, পেটের গণ্ডগোল নিরাময়ে গো-মাংস পথ্য হিসেবে বিধান দিয়েছে। সুশ্রুতের মতে, শ্বাসকষ্ট, শ্লেষ্মাজনিত সমস্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বরে গো-মাংস ওষুধের কাজ করে। সুশ্রুত গরুর মাংসকে ভগবানের পবিত্র দান রূপে চিহ্নিত করেছে। গর্ভবতীকে গো-মাংস খাওয়ালে গর্ভস্থ শিশু বলবান হয়।


সপ্তম শতাব্দীতে, চিকিৎসকগন ভগবত গোমূত্র ও গো-কন্যা বিবিধ রোগ নিরাময়ের জন্য বিধিপত্র (প্রেসক্রিপশন) দিত। গরুর পঞ্চ উপাদানে প্রস্তুত পঞ্চ গর্ভের আধুনিক সংস্করণ পঞ্চমর্ত্য যা পূজা-পার্বণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পাসর, বৈষ্য ও শঙ্করের মতে, ‘গরুর মুখ ছাড়া সব অংশ আহারযোগ্য ও পাপ মোচনে ব্যবহারযোগ্য।’ শল্যবিদ সুশ্রুত এক হাজার ২০টি রোগের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছে সুশ্রুত সংহিতায়। সুশ্রুতকে প্লাস্টিক সার্জারির জনক বলা হয়। তিনি শতাধিক মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছিলেন। প্রাচীন ভারতে গো-মাংস ভক্ষণের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে পিভি কেইন সম্পাদিত বৈদিক যুগের ৫ (পাঁচ) খণ্ড ধর্মশাস্ত্রের ইতিহাসে।


ভারতের জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও গো-মাংসে তৃপ্তি পেতেন, গৌতম বুদ্ধও একসময়ে গো-মাংস আহার করতেন। জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীরও গো-মাংস ভক্ষণ করতেন। পরবর্তীকালে তারা উভয়ে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন ধর্মীয় কারণের জন্য নয়, “বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের সাথে ব্রাহ্মণদের সাথে পার্থক্য সৃষ্টির জন্য ও রাষ্ট্রীয় শাসন সুবিধার জন্য।”


গো-হত্যা প্রাচীন যুগে মহাপাপ বলে স্বীকৃত হয়নি। 


রিগবেদ ও উপনিষদের সাতটি মহাপাপ হলোঃ (১) ব্রাহ্মণকে অপমান; (২) ব্রাহ্মণ হত্যা; (৩) চৌর্যবৃত্তি; (৪) প্রতারণা; (৫) মদ্যপান (সুরাপান); (৬) গুরু স্ত্রীর সাথে যৌনাচার এবং (৭) ব্যভিচার।


আরবরা ভারতে পৌঁছে গো-মাংস আহারে পরিচিত হয়। ভাগ্যের অন্বেষণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী রাজা ও দলপতিরা ভারত বিজয় করেছেন বিভিন্ন শতাব্দীতে। এদের কেউ এসেছেন ইরান থেকে, কেউ বা আফগানিস্তান থেকে, কেউ বা তুরস্ক থেকে, কেউ মধ্যপ্রাচ্য, কেউ বা রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। তাদের দীর্ঘ পথযাত্রায় খাদ্যের জোগান এসেছে বনজ প্রাণী, হরিণ, অশ্ব, উট, দুম্বা, গণ্ডার ও মহিষ থেকে। রোদ্রে শুকিয়ে এসব প্রাণীর মাংস দীর্ঘ দিন রেখে খাওয়া যায়। গো-মাংস কখনো এদের যাত্রাপথের সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত হতো না। ধাই মাতার সাথে আরবদের দীর্ঘ বন্ধন ছিল। তাই দুধদানকারী প্রাণী হত্যায় তাদের মানসিক অস্বস্থিবোধ ছিল। চারণভূমির স্বল্পতার কারণে গৃহপালিত গরুর সাথে তাদের পরিচয় ছিল সীমিত। মরুভূমি দেশ আরবে চারণভূমির অভাব সর্বজনজ্ঞাত। মঙ্গোলিয়াবাসীরা ছিল ব্যতিক্রম। মঙ্গোলিয়ায় ব্যাপক চারণভূমি রয়েছে। গৃহপালিত প্রাণীর রক্ষণাবেক্ষণ মঙ্গোলিয়াবাসীর মূল পেশা।


আরবরা ভারতে প্রথম পর্দাপণ করে ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে, স্থলপথে নয়, সমুদ্রপথে। আরব সেনাপতি সোহেল বিন আবদি ও হাকাম আল তাকবি ভারত সমুদ্রে রাজিলের যুদ্ধে ভারতীয়দের পর্যুদস্ত করে সিন্ধুতে পৌঁছেন। ভারতের পথে সেনা অভিযানে পূর্বানুমতি না নেয়ার কারণে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে তাদের আরবে ফিরে যেতে হয় খলিফা ওমরের নির্দেশে। সমুদ্রাভিযানে আরব সেনানিদের খাদ্য ছিল খেজুর, উট ও দুম্বার শুকনো মাংস। আরবরা দুগ্ধবতী প্রাণীর মাংস ভক্ষণে কখনো উৎসাহ বোধ করেনি। খলিফা ওসমানের আমলে ৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে আরবরা মাকরান এবং ওমাইদ খলিফা মাবিয়ার আমলে ৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে পাঞ্জাব বিজয় করে। মুহাম্মদ বিন কাশিম আরবদের সিন্ধুতে বসতি স্থাপন করায় ৭১০ খ্রিষ্টাব্দে। ঐতিহাসিক আলবেরুনি ভারত সফর করেছিলেন ১০৩০ খ্রিষ্টাব্দে। পরবর্তীকালে উজবেকিস্তান থেকে আগত তৈমুর লং, গজনীর সুলতান মাহমুদ, মহাম্মদ ঘোরী, বখতিয়ার খিলজি প্রমুখ ভারত বিজয় করে শাসন করেছেন প্রায় চার শ’ বছর।


১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে জহির উদ্দিন বাবর ভারত বিজয় করে মোঘল সাম্রাজ্যের পত্তন করেন।ভারতে পৌঁছে ভাগ্য অন্বেষণকারী বিজয়ী মুসলমানেরা কৃষিকাজে ব্যাপক সংখ্যক গরুর ব্যবহার এবং একই সাথে ভারতীয়দের গরু বধ করে গো-মাংস আহার ও ধর্মীয় কাজে ব্যাপক গো-মাংস বিতরণ দেখে বিস্মিত হন। তারা লক্ষ করেন, গরুর দুধের বিবিধ ব্যবহার সরাসরি দুগ্ধপান, দই, মাখন, ছানা ও ঘি উৎপাদনে। ভারতীয়দের গোবর ভক্তিতে মুসলমানরা আশ্চর্যান্বিত হয়েছেন। গোবর ব্যবহৃত হতো মন্দিরের বেদী পরিষ্কার করার নিমিত্তে এবং গোবর খাইয়ে ভক্তের পাপ মোচনে। নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা গোবর শুকিয়ে ব্যবহার করত জ্বালানি হিসেবে। গরুর লেজের ঝোল ও গোমূত্রের ওষুধ হিসেবে ব্যবহারে মুসলমানেরা হতবাক হয়ে পড়েন। ভারতে বনজ প্রাণীর স্বল্পতার কারণে অন্যদেশ থেকে আগত মুসলমানেরা ক্রমে ক্রমে গো-মাংস আহারে অনুরক্ত হয়ে পড়েন এবং একেক দেশের মুসলমানরা একেক রকমের মসলা, চর্বি ও তৈল সংযোগ গো-মাংস রন্ধনে বৈচিত্র্য আনেন। তুর্কি, মোগল, পারসিদের গো-মাংস রন্ধন প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রসনা তৃপ্তির স্বাদ বিস্তার লাভ করেছে ভারতের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে।


অল্পবয়সী গো-শাবক মাংসে ব্রাহ্মণদের আসক্তির কারণে গাই গরুর সংখ্যা কমতে থাকলে কৃষিতে সমস্যা দেখা দেয় এবং দুধেরও অভাব সৃষ্টি হয়। গরুর দুধের স্বল্পতায় শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা স্বাস্থ্য সঙ্কটে পড়ে। চাষাবাদের ক্ষতিরোধ করার লক্ষ্যে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর ও আওরঙ্গজেব গো-হত্যা সীমিত করেন, গো বধের আগে কাজীর অনুমতি নেয়ার বিধানও চালু করেন। এতে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীরা খুশি হলেও ব্রাহ্মণরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। তাদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ বলে প্রচারণায় চেষ্টা করে ব্রাহ্মণরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।  মুসলমানরা ভারতে গো-হত্যা আরম্ভ করেননি, গো-মাংস আহারের প্রচলনও করেনি। বরঞ্চ মুসলমান শাসকরা গো-হত্যা সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন কৃষিকাজের উন্নয়ন এবং শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষার নিমিত্তে।
ধর্মীয় বিধান নয়, ভারতে গো-বধের সামাজিক আচার থেকে গো-রক্ষার

রাজনীতি
প্রাচীন ভারতে গো-হত্যা মহাপাপ দূরে থাকুক, সাধারণ পাপ হিসেবে বিবেচনা হতো না। তবে ‘শুধুমাত্র ব্রাহ্মণের গরু চুরি অপরাধ’ হিসেবে গণ্য হতো।মধ্যযুগে সম্রাট অশোকের আমলে (খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ থেকে ২৩২) মূলত বৌদ্ধধর্মের সুবিধার্থে এবং হিন্দুধর্মের সাথে দৃশ্যমান পার্থক্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সম্রাট অশোক সৃষ্ট ৮৪ হাজার স্তূপের মধ্যে মাত্র তিনটি স্তূপে গো-বধ রোধের প্রস্তাবনা লিপিবদ্ধ রয়েছে।

মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে একাধিকবার পরাজিত মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি শিবাজি ভোসলে (১৬৩০-১৬৮০) বিজয়পুর গুহায় আত্মগোপন করেন। পরাজয়ের গ্লানিতে তার সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তিনি শঠতা ও ছলনার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে ভগবানের পুর্নজীবন প্রাপ্ত অবতার ঘোষণা দিয়ে হিন্দুদের উজ্জীবিত করে এবং গো-হত্যা নিষিদ্ধ করে। এতে হিন্দুদের পাশাপাশি বৌদ্ধ ও জৈনরা খুশি হয় এবং তারা ভারত রক্ষার সংগ্রামে যুক্ত হয় অবতার ভগবান শিবাজির নেতৃত্বে। রায়ঘর দুর্গে অবস্থানরত ছত্রপতি শিবাজি ভোসেলের মৃত্যু হয় ৩ এপ্রিল ১৬৮০ খৃষ্টাব্দে এবং পতন হয় মারাঠা রাজ্যের। তবে গো-রক্ষা আন্দোলন নিঃশেষ হয় না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিবাজি উৎসবে লিখলেন”ধ্বজা করি উড়াইব বৈরাগীর উত্তরী বসন দারিদ্র্যের বল, এক ধর্মরাজ্য হবে এ ভারতে’ এ মহাবচন করিব সম্বল।”

১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পাঞ্জাবে গো-রক্ষা রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়, দয়ানন্দ সারাভাস্তি ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম গো-রক্ষা সভা অনুষ্ঠান করেন যা ক্রমেই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় পরিণত হয়। উত্তর-পশ্চিম ভারতের হাইকোর্ট ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে গরু পবিত্র প্রাণী নয় বলে রায় দেয়ার পরও আজমগড়ে ব্যাপক দাঙ্গা হয় ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে এবং শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। অযোধ্যায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার পুনরাবৃত্তি ঘটে ১৯১২-১৩, ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে এবং সাম্প্রতিকালেও একাধিবার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে গো-মাংস ভক্ষণ করলেও স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬০-১৯০২) পরবর্তীতে ভারতে ফিরে গো-রক্ষার প্রবক্তা হন।গো-রক্ষার স্রোতের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে একমাত্র রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) গো-মাংস ভক্ষণের অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য ক্রমাগত ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছেন। আধুনিক যুগে রক্ষণশীলতা পরিহার করে নির্বিবাদে গোবরের জ্বালানি ও ওষুধি হিসেবে ব্যবহার এবং গো-মাংস ভক্ষণের অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হচ্ছে, Hindu Authorities in favor of slaying the cows and eating its flesh. রাজা রামমোহন রায় হিন্দু ধর্মের বিভাজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে ভারতীয় রাজনীতিতে তার প্রবেশ সহজ করার লক্ষ্যে বেছে নেন গো-রক্ষায় আন্দোলন এবং প্রকাশ করলেন পবিত্র গাভী (Sacred Cow) তথ্য। মহাত্মা গান্ধীর পবিত্র গাভী (Sacred Cow) তথ্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে এবং গো-রক্ষা আন্দোলন জোরদার হয়। গান্ধী লিখলেন ‘মা এবং দুগ্ধদানকারী গাভী উভয় অতীব প্রয়োজনীয়। তবে গাভীর অবদান বেশি। সন্তান জন্মের প্রথম কয়েক বছর স্তন্যদান করেন এবং প্রত্যাশা করেন যে, পরবর্তীতে সন্তানরা মাকে দেখাশোনা করবে, অসুস্থ হলে তার সেবাযত্ন করবে। গাভী কশ্মিনকালে রোগাক্রান্ত হয়। মা মারা গেলে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করে কবরস্থ বা শবদাহ করতে হয়। অপরপক্ষে মৃত গাভীর চামড়া থেকে শুরু করে প্রতিটি অঙ্গ আমাদের অর্থের জোগান দেয়।’গান্ধীর বক্তব্যে ভর করে রাষ্ট্রের সেবক সঙ্ঘ (আরএসএস), বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরঙ্গ দল গো-রক্ষা আবেদন তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে। এ জাতীয় প্রচারণার কারণে সব ভারতীয় রাজনৈতিক দল গো-হত্যা নিষিদ্ধ করে গো-রক্ষার ধারা ভারতীয় সংবিধানে যুক্ত করার দাবিতে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় পার্লামেন্টের সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ করে। বজরঙ্গদল গো-হত্যা নিষিদ্ধকরণের জন্য ৩০ লাখ কর্মী সমাবেশ করে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী কেশুভাই প্যাটেল গো-রক্ষার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। গান্ধীর পুনজন্ম রূপে পরিচিত আচার্য বিনোবা ভাবে এপ্রিল ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে দীর্ঘমেয়াদি অনশন পালন করে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে বাধ্য করেন গো-হত্যা নিষিদ্ধ করে গো-রক্ষা আইন প্রণয়নে।


নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মারবিন হ্যারিসের মতে, গান্ধীর গাভী তথ্য ছিল ব্রিটিশ ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের বড় অস্ত্র। ‘গরু ঘিরে’ (Rallying round the Cow) রাজনীতির বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা ভারতীয় ইতিহাসবিদ রনজিৎ গুহ। ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর হিন্দুদের গো-মাংস আহারের রাজনীতির বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন ‘The Untouchables: Who were they and why they Become Untouchables’ বইতে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে।


 মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার মূলমন্ত্র ভারত প্রজাতন্ত্রের ভাগ্য নির্ধারণে নিয়োজিত ব্রাহ্মণদের অন্তরে কখনো স্থান পায়নি। ভারতে অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ, ধর্মীয় অনুশাসন পালনে বাধা ও ঘৃণা সৃষ্টির জন্যই মূলত গো হত্যা বন্ধের রাজনীতি করছে।


তথ্যসূত্র :

  • ১. The Myth of the Holy Cow, Navayana Publishing, New Delhi,2015, 4th Reprint
  • ২. W. Crooke, The Veneration of the Cow in India, Folklore, London, 1912
  • ৩. R.K Dasgupta, Spirit of India, The Statesman, ১৫ মার্চ ২০০১ এ পুনঃ মুদ্রিত।
  • ৪. M.K. Gandhi, How to Serve the Cow, Navajivan, Ahmedabad,1954,১৯৫৪.
  • ৫. Marvin Harris,The Cultural Ecology of India’s Sacred Cattle, Current Anthropology ১৯৬৬.
  • ৬. Ranajit Guha, Rallying round the Cow, Subaltern Studies Oxford University Press, Delhi 1983.
- Advertisement -
পূর্ববর্তী নিবন্ধখালেদা জিয়া যেন উলুবনে একজন মুক্তা
পরবর্তী নিবন্ধচা উপাখ্যান

আরও লেখা

1 মন্তব্য

  1. অসাধারণ তথ্যবহুল একটা আর্টিকেল…. লেখক হুমায়ুন ভাইয়ের কাছ থেকে এই ধরনের তথ্যবহুল লেখা রেগুলার আশা করছি…. ধন্যবাদ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

1 + 11 =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা