32 C
Dhaka
বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২১

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় লড়াই করে

যা পড়তে পারেন

:: মারুফ কামাল খান ::

এখন লুপ্ত হয়ে গেছে দৈনিক দেশ। প্রেসিডেন্ট জিয়া পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হাত বদল হয়ে পরে এর মালিকানা ন্যস্ত হয়েছিল মঈদুল ইসলাম মুকুলের হাতে। মুকুল সাহেব তখন দেশের সেরা ধনীদের একজন। মস্ত শিল্পপতি। কাশেম গ্রুপ নামের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কর্ণধার। মুকুল সাহেব প্রেসিডেন্ট জিয়ার ক্যাবিনেটে মন্ত্রী ছিলেন। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর দৈনিক দেশ ও তার ওপর খুব চাপ আসে। পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে মুকুল সাহেবকে জেলে ঢোকানো হয়। এক পর্যায়ে ভদ্রলোক আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। জেল থেকে বেরিয়ে এরশাদের দলে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হন। পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিও পালটে প্রো-এরশাদ করার জন্য সাংবাদিকদেরকে বলেন। কিন্তু এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে ভেতর থেকেই শুরু হয় প্রতিরোধ। দৈনিক দেশে কর্মরত প্রবীণ সাংবাদিকেরা খানিকটা আপস করে টিকে থাকার পক্ষপাতি হলেও আমরা যারা তরুণ তুর্কী ছিলাম, তারা বেঁকে বসি। না, নীতির প্রশ্নে কোনো আপস নয়। শুরু হয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত। পত্রিকা স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে যায় এক পর্যায়ে। আমরা বেকারত্ব বরণ করে নিই। সীমাহীন কষ্টের মধ্যে পড়ি। কিন্তু নীতিতে অটল থেকেছি শেষ অব্দি। নীতির প্রশ্নে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে এর পরেও মালিক ও সরকারের সাথে অনেক বার দ্বন্দ্ব হয়েছে। এক কথায় চাকরি ছেড়ে চলে এসেছি। নিজে কষ্ট করেছি, পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছি, মাথা বিকিয়ে দিইনি।আত্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, এসব কথা বলছি তার কারণ হচ্ছে ইদানিং প্রচারিত একটা তত্ত্ব। বলা হচ্ছে, সাংবাদিকরা আসলে অসহায়। বলা হচ্ছে, আসলে সাংবাদিকদের কোনো স্বাধীনতা নেই, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানে মালিকের স্বাধীনতা। বলা হচ্ছে, সত্য প্রকাশে ব্যর্থ হবার জন্য কোনো দায় সাংবাদিকের নেই, এর পুরো দায় কেবল সরকার ও মালিকের। জ্বী না স্যার, দ্বিমত পোষণ করছি। সাংবাদিকেরও দায় আছে এবং অবশ্যই আছে।

সাংবাদিকও আসে ঝুঁকি নেয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়ে। আপনি সব জেনেশুনেই যখন এ পেশায় আসেন তখন সত্যের জন্য ঝুঁকি নেয়ার অঙ্গীকার পূরণ আপনার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় লড়াই করে এবং প্রতিনিয়ত লড়াই করেই তা টিকিয়ে রাখতে হয়। কেউ কখনও সোনার থালায় করে সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে উপহার দিয়ে যায়না। সত্য প্রকাশে ঝুঁকি নেবেন না, প্রতিবাদী হবেন না, কষ্ট করবেন না, লাঞ্ছিত হবেন না, সীমাহীন আর্থিক দুর্গতি পোহাবেন না, কর্পোরেট পুঁজির দাস হবেন, তারিয়ে তারিয়ে বিলাস-ব্যসন ও গ্ল্যামার ভোগ-উপভোগ করবেন, ব্ল্যাকমেইলিং করবেন, প্রতিঘাতে অক্ষমদের ওপর প্রতিপত্তি দেখাবেন, তাদের সঙ্গে বেয়াদপি করে সেটাকে সাহস হিসেবে জাহির করবেন আর সরকার ও মালিকের পায়ের কাছে লেজ গুটিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে কুঁইকুঁই করবেন, তাদের অনৈতিক স্বার্থের পাহারাদার হবেন আবার কলামে-টকশোতে নীতিকথার তুবড়ি ছুটিয়ে সাংবাদিক পরিচয় টাটকা ও তরতাজা রাখবেন!জ্বী না, আপনি সাংবাদিক নন।

সাংবাদিক যখন সত্যের অবাধ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হবেন তখন এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা তার অবশ্যই আছে। সে বাধা সরকার বা মালিক যে তরফ থেকেই আসুক। প্রতিবাদে কাজ না হলে সাংবাদিক চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারেন। সে স্বাধীনতাও তার আছে।আমরা যখন ঝুঁকি নিতাম তখন আমাদেরকে হঠকারি বলে গালি দেয়ার অনেক লোক ছিল। কেউ কেউ আমাদের সাহসকে পাগলামী ও নির্বুদ্ধিতাও বলেছেন। কিন্তু জগতজুড়ে এরকম হঠকারী, পাগল ও বুদ্ধিহীনেরাই কিন্তু সত্য প্রকাশের অধিকার, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে সমুন্নত রেখে চলেছেন।

মূলধারার সাংবাদিকতায় সত্যের প্রকাশ বিপন্ন হওয়ায় নিজেকে বিপন্ন করে বিকল্প ধারায় সত্যকে সমুন্নত রেখে জুলিয়ান অ্যাজাঞ্জ তার সাম্প্রতিকতম উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।কেউ আপনাকে সাংবাদিক হতে বাধ্য করেনি। এটা পেশা শধু নয়, ব্রতও। এখানে ঝুঁকি আছে, বিপদ আছে, বিপন্নতা আছে, কষ্ট আছে, দারিদ্র আছে, সেই সাথে আছে মর্যাদা ও সম্মান। এটা সৈনিকের মত পেশা। সৈনিক প্রয়োজনে জীবন দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে পেশায় আসে।

সাংবাদিকও আসে ঝুঁকি নেয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়ে। আপনি সব জেনেশুনেই যখন এ পেশায় আসেন তখন সত্যের জন্য ঝুঁকি নেয়ার অঙ্গীকার পূরণ আপনার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় লড়াই করে এবং প্রতিনিয়ত লড়াই করেই তা টিকিয়ে রাখতে হয়। কেউ কখনও সোনার থালায় করে সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে উপহার দিয়ে যায়না। সত্য প্রকাশে ঝুঁকি নেবেন না, প্রতিবাদী হবেন না, কষ্ট করবেন না, লাঞ্ছিত হবেন না, সীমাহীন আর্থিক দুর্গতি পোহাবেন না, কর্পোরেট পুঁজির দাস হবেন, তারিয়ে তারিয়ে বিলাস-ব্যসন ও গ্ল্যামার ভোগ-উপভোগ করবেন, ব্ল্যাকমেইলিং করবেন, প্রতিঘাতে অক্ষমদের ওপর প্রতিপত্তি দেখাবেন, তাদের সঙ্গে বেয়াদপি করে সেটাকে সাহস হিসেবে জাহির করবেন আর সরকার ও মালিকের পায়ের কাছে লেজ গুটিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে কুঁইকুঁই করবেন, তাদের অনৈতিক স্বার্থের পাহারাদার হবেন আবার কলামে-টকশোতে নীতিকথার তুবড়ি ছুটিয়ে সাংবাদিক পরিচয় টাটকা ও তরতাজা রাখবেন!জ্বী না, আপনি সাংবাদিক নন।

আপনি পুঁজি, ক্ষমতা ও কায়েমী রাজনীতির স্বার্থান্ধ দাস। আপনি সাংবাদিক নামের কলঙ্ক। আপনাদেরকে আমি এবং আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি, খুব ভালো করেই চিনি এবং নিশ্চিত করেই জানি আপনি সত্যের প্রতিপক্ষ, আপনি মানুষ ও তার মর্যাদার বৈরী। যত নিরাপদ, বিলাসী, আয়েশী জীবন কাটান না কেন, আপনি ক্লেদাক্তই থাকবেন। কখনোই আপনার নাম মর্যাদার সঙ্গে উচ্চারিত হবেনা।

লেখকঃ সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

9 − eight =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা