28 C
Dhaka
মঙ্গলবার, জুন ২২, ২০২১

সাংবাদিকরা জীবিকার তাগিদে আত্মসমর্পণ করছেন

যা পড়তে পারেন

:: মারুফ কামাল খান ::

সাংবাদিকদের ওপর আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের খুব রাগ। তারা হরদম সাংবাদিকদের কষে গাল দিয়ে মনের ঝাল মেটান। আমি নিজে সাংবাদিক হয়েও সাংবাদিকতা নামের বর্তমান যে ক্যারিকেচার তাতে রুষ্ট। আমিও নানা উপলক্ষে এসবের সমালোচনাও করি। তবে আমি এ অঙ্গনের লোক হিসেবে বাস্তব অবস্থাটা জানি এবং সমালচনার সময় সেটা ভুলে যাইনা। আমি তাই ঢালাও ভাবে সাংবাদিকদের গাল না দিয়ে অপ-সাংবাদিকতার নিন্দা করি।বিগত অনেক দিন ধরেই রাষ্ট্রীয় ভাবে নিরপেক্ষ ও সত্যানুসন্ধানী এবং ভিন্নমতের মিডিয়াগুলো একে একে বন্ধ করা, অকেজো করা বা নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়েছে। ফলে ভালো সাংবাদিকদের বড় অংশ বেকার। কেউ কেউ জীবন-জীবিকার তাগিদে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছেন। আর দলান্ধ স্তাবকেরা তো আজান দিয়ে নেমে পড়েছে। এখন তাদের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। তাদের হাতে তেলের ভাণ্ড, কণ্ঠে বেসুরো গান: ‘ওলোট পালোট করে দে মা, লুটেপুটে খাই।’

পোস্ট-ট্রুথ সমাজে মিডিয়া থেকে শুরু করে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা পর্যন্ত সব কিছু মিলিয়ে একটা নেক্সাস তৈরি হয়। পুঁজি ও সমরসম্ভারে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোতে এই নেক্সাসকে নিয়ন্ত্রণ করে ডিপ স্টেট। মার্কিন মুলুকে ট্রাম্প-এর ধরাশায়ী হওয়া এবং বাউডেন-হারিসের জয়ে আমরা খুশি। তবে এই ফলাফল নির্মাণে পোস্ট-ট্রুথ নেক্সাসের যে নিরলস ভূমিকা ছিল, সেটাও কিন্তু ভুললে চলবে না। আমার এই আলোচনা খুব একাডেমিক হয়ে যাচ্ছে। তাই সকলে বিরক্ত হয়ে উঠবার আগে এখানেই ব্রেক কষি। তবে গল্প ফুরিয়ে গেলে নটে গাছটি মুড়াবার আগে বলে যাই, এর প্রতিকারও আছে। সেই প্রতিবিধানের পথ হোলো যে-মুদ্রায় ঋণ করে প্রতিপক্ষ এ অবস্থায় এনেছে তাদেরকে সেই মুদ্রাতেই ঋণ শোধ করে দেয়া।

আর এর ফলে দেশে এখন কেবল অপসাংবাদিকতাটুকুই দৃশ্যমান হচ্ছে। সৎ সাংবাদিকতার গুমরে মরা কান্না নজরে আসছে না।রাজনৈতিক অঙ্গনেই দেখুন, যে-সব বিরোধী দলের প্রতি সাধারণ মানুষের ৭০-৭৫% শতাংশের সমর্থন তাদের তৎপরতা ও কার্যক্রম এমন ভাবে আটকে রাখা হয়েছে, যেন তাদের অস্তিত্বই নেই। আর ২০-২৫% ভাগের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতাবানরা এমনভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে যেন, ওদের পেছনেই ৮০% মানুষের সমর্থন। ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এভাবেই মিথ্যা ও ভুলকে সত্য হিসেবে দৃশ্যমান করা।

আসলে আমরা পোস্ট-ট্রুথ যামানায় বাস করছি।পোস্ট-ট্রুথ হচ্ছে এমন একটি অনভিপ্রেত পরিস্থিতি যেখানে মূল সত্যকে খারিজ করা হয় ও ব্যক্তিগত মতামত এবং আবেগনিষ্ঠ ধারণাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এমন একটি পরিস্থিতিতে জনমতও ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে এই পোস্ট-ট্রুথ বা উত্তর-সত্যের ওপরে ভিত্তি করেই গঠিত হয়। বিশ্বাস এবং সমষ্টিগত ধারণাতে পরিবর্তন আনতে ইচ্ছাকৃত ভুয়ো সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে একাংশ।

২০১৫ সালে গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ জেসন হার্সিন পোস্ট-ট্রুথ রাজনীতির নিরিখে একটি সুন্দর শব্দবন্ধ বা বাক্যাংশ সৃষ্টি করেছিলেন – রেজিম অফ পোস্ট-ট্রুথ, যা বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় উত্তর-সত্য শাসন। হার্সিনের মতে, বিশ্বব্যাপী কিছু অভিসারী ঘটনা পোস্ট-ট্রুথ সমাজের সূচনা করেছে। এই ঘটনাসমূহের মধ্যে প্রধান হচ্ছে সমাজের কিছু সংখ্যক মানুষকে লক্ষ্য করে মিথ্যে খবর এবং গুজব প্রচার করা, যাতে তাঁদের বিশ্বাস এবং সমষ্টিগত ধারণাতে পরিবর্তন আনা যায়। সত্যি এবং মিথ্যার মধ্যে তফাৎ নির্ণয়ের অক্ষমতা এবং সামাজিক মাধ্যমের বহুল ব্যবহার এতে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে।

আজকে ইন্টারনেটের সার্চ ইঞ্জিনগুলো ঠিক সেই তথ্যসমূহই ওপরে রাখে, যা মানুষ চায়। সত্যের উপরে তাই আর কোনো গুরুত্ব আরোপ করা হয় না। আজ গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের পরে প্রশ্ন উঠছে। প্রত্যেকটি সংবাদ সংস্থা কোনও না কোনও ভাবে খবরের বিকৃতি ঘটাচ্ছে – কেউ বা অন্য জায়গা থেকে খবর চুরি করছে, কেউ বা খবরের নামে প্রচার করছে গুজব, মিথ্যা সাফল্যের মহিমা বা কুৎসা। আর কেউ বা সম্পূর্ণ মিথ্যে খবর ছড়াচ্ছে। তাই নিউজ ভ্যালুজ নামক শব্দটা একটি প্রহসনে পরিণত হয়েছে।আমাদের দেশে প্রচারমাধ্যম যে কোনো একসময় এমন নগ্নভাবে একতরফা হয়ে উঠবে, সে আগাম ধারণা কি রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারকদের ছিল না? তারা এর প্রতিকারে ব্যবস্থা নেন নি কেন? এই প্রশ্ন ও সমালোচনা অনেকেই করেন। এটা অযৌক্তিকও নয়। তবে কেবল প্রচারমাধ্যমের কথা নয়, প্রশাসন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার ব্যবস্থা, কালচারাল ফ্রন্ট, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলো সহ প্রতিটি অঙ্গন-প্রাঙ্গনেই তো একই অবস্থা।

একতরফা আধিপত্যের জয়-জয়কার।শুধু বাংলাদেশ নয়। ইন্ডিয়ায় ছিটেফোঁটা হলেও কিছুটা অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ছায়া আছে। কংগ্রেস সেখানে টানা প্রায় পাঁচ যুগ রাজত্ব করেছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সংঘ পরিবার এবং তাদের পলিটিক্যাল ফেস বিজেপি যে প্রচারমাধ্যম, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক কাঠামো, গবেষণা ও কূটনীতি সহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমন আসন গেড়ে বসেছে যা তারা শোচনীয়ভাবে ভিক্টিম হবার আগ পর্যন্ত টেরই পায়নি। তবে তাদের স্ট্রং সিভিল সোসাইটি বা নাগরিক সমাজ থাকায় এবং আরও কিছু কারণে এখনো কিছুটা হলেও সেখানে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স রয়ে গিয়েছে। আমাদের এখানে ব্যাপারটা সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসীভাবে একতরফা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পোস্ট-ট্রুথ সমাজে মিডিয়া থেকে শুরু করে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা পর্যন্ত সব কিছু মিলিয়ে একটা নেক্সাস তৈরি হয়। পুঁজি ও সমরসম্ভারে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোতে এই নেক্সাসকে নিয়ন্ত্রণ করে ডিপ স্টেট। মার্কিন মুলুকে ট্রাম্প-এর ধরাশায়ী হওয়া এবং বাউডেন-হারিসের জয়ে আমরা খুশি। তবে এই ফলাফল নির্মাণে পোস্ট-ট্রুথ নেক্সাসের যে নিরলস ভূমিকা ছিল, সেটাও কিন্তু ভুললে চলবে না। আমার এই আলোচনা খুব একাডেমিক হয়ে যাচ্ছে। তাই সকলে বিরক্ত হয়ে উঠবার আগে এখানেই ব্রেক কষি। তবে গল্প ফুরিয়ে গেলে নটে গাছটি মুড়াবার আগে বলে যাই, এর প্রতিকারও আছে। সেই প্রতিবিধানের পথ হোলো যে-মুদ্রায় ঋণ করে প্রতিপক্ষ এ অবস্থায় এনেছে তাদেরকে সেই মুদ্রাতেই ঋণ শোধ করে দেয়া।

লেখকঃ সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেস সচিব

- Advertisement -

আরও লেখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

5 + 2 =

- Advertisement -

সাম্প্রতিক লেখা